আবারও প্রশ্নের সম্মুখীন চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

2
ব্রেকিং নিউজ
  •                                                                                                                                    
ctg_port-container-3
.

আবারও প্রশ্নের সম্মুখীন দেশের কি পয়েন্ট ইনস্টেলশন (কেপিআই) চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতির বিষয়ে একাধিক সভায় বিজিএমইএ দৃষ্টি আকর্ষন করেছিলেন বন্দর কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু তাদের কর্তৃপক্ষের কোন ধরনের টনক নড়েনি।

চট্টগ্রাম থেকে ভারতগামী জাহাজের কন্টেইনারে কমপক্ষে ১২ দিন অনাহারে আটকে থাকার পর গত বুধবার মুমূর্ষু একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তম বন্দরে ।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম রোহানউদ্দিন (২৮), পেশায় এয়ারকন্ডিশনিং মেকানিক এবং বাড়ি বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলায় বলে জানিয়েছেন। মেকানিক বলে দাবি করলেও তিনি একজন শ্রমিক হতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। ২০১১ সালের এপ্রিলের। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নেশাগ্রস্ত এক শ্রমিক কন্টেইনারে আটকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে প্রায় ৯দিন পর উদ্ধার হয়েছিল আধামরা অবস্থায়।
এই ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল দেশ-বিদেশের শিপিং মহল। সেটা এখনও অনেকের মনে আছে। এর মধ্যে আবারও ঘটলো সেই একই ঘটনা।

বিশাখাপত্তম বন্দরের বিশাখা কন্টেইনার টার্মিনাল (প্রাঃ) লিমিটেডে ঐ লোককে উদ্ধার করা হয়েছে মুমূর্ষু অবস্থায়। তাকে কিং জর্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে পুলিশি তত্ত্বাবধানে।

t
.

তাছাড়া, কন্টেইনার থেকে উদ্ধারের সময় যে অবস্থা দেখা গেছে তাতে অনুমান করা হচ্ছে যে তিনি কোন কারণে এর ভিতর আটকে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে কোন খাবার বা পানীয় থাকার নিশানা পাওয়া যায়নি খালি কন্টেইনারটি তল্লাশি করে। তারপরও কেউ তাকে পাচার করেছে কী না, বা তিনি নিজে এভাবে এসেছেন কী না সেটা তদন্ত করে দেখছে ওখানকার পুলিশ। পূর্ণ সুস্থ হলে জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হওয়া যাবে সেটা।

বিশাখাপত্তম বন্দরে যোগাযোগ করা হলে উর্ধতন কর্মর্তা ভি. কল্যাণ চক্রবর্তী জানান, সিএআরইউ ২১৬৬৮৮০ নম্বর কন্টেইনার থেকে লোকটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। কন্টেইনারটি বুক করে স্থানীয় সামসারা শিপিং কোম্পানি। তারা জেনেভার মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানির সেখানকার এজেন্ট। পানামা পতাকাবাহী জাহাজ সিনারবাতাম-এ চট্টগ্রাম থেকে কন্টেইনারটি গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার প্রায় ১২ দিন পর কন্টেইনারটি খোলা হয়েছে। তাই নিশ্চিত করে বলা যায় তিনি কমপক্ষে এই বারোদিন ছিলেন এর ভিতরে আটকে।

জানা যায়, ট্রেইলারে তোলার আগে এটার দরজা খোলা হলে ভিতরে মৃতপ্রায় লোকটিকে দেখে বন্দর কর্মীরা দ্রুত পুলিশকে জানায়। উদ্ধার করে লোকটিকে হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানির এজেন্ট মারকো শিপিং কোম্পানি (বিডি) লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার বোরহান উদ্দিন আহমেদ-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিনারবাতাম জাহাজটি গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নোঙ্গর তুলে যায় এবং এর পরদিনই বিশাখাপত্তম গিয়ে পৌঁছে।

jiban2
.

অনুসন্ধানে জানা যায়, যে কন্টেইনারে আটকে লোকটি গেছেন সেটা কিউএনএস কন্টেইনার ডিপোতে ছিল। সেখান থেকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল-২ হয়ে শিপমেন্ট হয়েছে। এর কোন এক পর্যায়ে লোকটি ওখানে ঢুকে আটকে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ডিপো থেকে খালি কন্টেইনার জেটি গেট দিয়ে প্রবেশের সময় সেখানে নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মীরা তার ভিতরে কিছু আছে কি না বিশেষত কোন লোক রয়েছে কিনা তা দেখেন। খালি কন্টেইনারের দরজা তখন খোলা থাকে। কাস্টমস-এর লোকজনের দায়িত্ব কন্টেইনারটা খালি কিনা সেটা পরখ করে দেখা। এরপর জাহাজে তোলার আগমুহূর্তে আরেকবার দেখেন বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ এবং অপারেটরের কর্মীরা।

খালি কন্টেইনার সাধারণত সীল করা থাকে না, তবে দরজা বন্ধ থাকে হালকাভাবে। এই বন্ধ করার সময়ও চেক করে দেখার নিয়ম ভিতরে। বর্তমান আইএসপিএস কোড অনুসারে জাহাজে তোলার পর সেখানে আরও একবার ক্যাপ্টেনের তত্ত্বাবধানে তল্লাশি হওয়ার কথা। আলোচ্য ক্ষেত্রে এসব নিয়মের কোনোটাই যদি পালিত হতো তাহলে এভাবে কন্টেইনারে লোক আটকে পড়া সম্ভব ছিল না বলে অভিমত একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের।

বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস এন্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনারস এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে ইকরাম চৌধুরী খালি কন্টেইনারে মানুষ আটকে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, অবশ্যই কিছুটা দায়িত্ব অপারেটরের উপর বর্তায়। তবে, হাজার হাজার কন্টেইনার যখন শিপমেন্ট হয় তখন বাস্তবে সেটা সম্ভব হয় না। বিশাল কন্টেইনারের ভিতরে থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর যদি ফোর্সড শিপমেন্ট হয় তখন একেবারে অসম্ভব।

বন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য যেখানে সংশ্লিষ্টরা রাত-দিন ঘর্মাক্ত হচ্ছেন, সেখানে সাড়ে ৫ বছরের ব্যবধানে আবারও জলজ্যান্ত একজন মানুষ কন্টেইনারে আটকে চলে গেলেন তা কেউ টের পেলেন না। নিরাপত্তা বিভাগ, কাস্টমস, ট্রাফিক বিভাগ, টার্মিনাল পরিচালনায় নিয়োজিত অপারেটর-সবার চোখের আড়ালে তা ঘটে গেল। এ ঘটনা কেপিআই-বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও প্রশ্নের সম্মুখীন করলো।

২০১১ সালের এপ্রিলের ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি করেছিল। কমিটি তদন্ত করে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধের জন্য বেশ কিছু সুপারিশও করেছিল। সে সব সুপারিশ হয়তো বাস্তবায়িত হয়নি অথবা সেগুলো যথাযথ ছিল না। হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সম্ভব ছিল না বলে অভিমত তথ্যাভিজ্ঞমহলের। ২০১১ সালের এপ্রিলের ঘটনায় বন্দর ইয়ার্ডে রাখা খালি কন্টেইনারে নেশা করতে ঢুকে আটকে যান দ্বীন ইসলাম ও আলআমীন নামে দুই শ্রমিক। তাদের মধ্যে আল আমীন পথে মারা যান। অপরজনকে সিঙ্গাপুরে উদ্ধার করা হয়।

২০১৪ সালের জুনে ১৩ নম্বর জেটি থেকে জসীমউদ্দিন (১৯) নামে একজন খালি কন্টেইনার থেকে বের হয়ে জাহাজে উঠার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত ৬ মাসের কারাদ- দেন। এদিকে এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার এক জরুরি বৈঠকে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো.জাফর আলম। তিনি বলেন, বন্দরের পরিচালক পরিবহন গোলাম সরওয়ারকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও দায়ীদের সনাক্ত করবে।

কমিটির বাকি তিন সদস্য হলেন-টার্মিনাল ম্যানেজার মো.সরওয়ার, উপ-পরিচালক (নিরাপত্তা) লে.কমান্ডার মো.নিজাম উদ্দিন ও হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন জহির।