গণমাধ্যমে প্রণোদনার পোস্টমর্টেম: রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

0
.

গণমাধ্যমের প্রণোদনা কার জন্য, কীসের জন্য ? এর বিন্দু ভাগ কি সাংবাদিকদের কপালে জুটবে ? নাকি শুধুই তেলে মাথায় তেল? এরকম নানা প্রশ্ন এখন খুব’ই প্রাসঙ্গিক।

গণমাধ্যমের সুরক্ষা চাই আমরা। তার মানে এই নয় যে, তা নিছক পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন মালিকপক্ষের জন্য । মাঠের সাংবাদিক থেকে শুরু করে সকল স্তরের কর্মী অর্থাৎ গণমাধ্যম পরিবারে এর সুফল মিলবে কিনা, তা খতিয়ে দেখা কিংবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।‌ কথা স্পষ্ট, আমরা মালিকপক্ষের জন্য প্রণোদনা চাইনা। সার্বিক সুরক্ষা চাই। – গণমাধ্যমের ইতিহাস সেই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা ভিন্ন।‌

মালিক কিংবা সাংবাদিক শুধু নয়, পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাঠের সকল কর্মী, কম্পিউটার অপারেটর, মেশিনম্যান, পিয়ন দারোয়ান, ড্রাইভার থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের কর্মীদের সুরক্ষা দরকার।‌

প্রশ্ন উঠতে পারে এও, মালিকপক্ষকে প্রণোদনা না দিলে কি অংশীজন সহায়ক কর্মীরা এর সুফল পাবেন?

বছরের পর বছর সরকারি প্রণোদনা নিয়েও দেশের সিংহভাগ পত্রিকা ও টেলিভিশনের মালিক গণমাধ্যমের কর্মীদের তার সিকি ভাগও দেননি। সংবাদপত্রে প্রতিটি ওয়েজবোর্ডের বিপরীতে মালিকপক্ষ বিজ্ঞাপনসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা পেলেও দেশের অন্তত শতকরা ৯০ ভাগ কাগজ গণমাধ্যমকর্মীদের তার হিস্যা দেননি। এক্ষেত্রে ঢাকার বেশ কিছু কাগজ তো রয়েছেই, ঢাকার বাইরের কাগজগুলোতে বঞ্চনা সীমাহীন। ‌

অতি আশ্চর্যের বিষয় যে, এসব মনিটরিংয়ের গঠিত ‘মনিটরিং সেল’ বরাবরই রহস্যজনক আচরণ করে গেছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের যে দায়িত্ব, তারাও তা পালন করেননি।‌

ঢাকার বাইরের কাগজগুলোতে মনিটরিং নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের শুধু ঢাকার নির্বাচিত নেতৃত্বের বাইরেও আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরও অন্তত ৩ বছর আগে এক বৈঠকে দাবি তুলেছিলাম। ‌তিনি আমার উত্থাপিত সেই দাবি নিজে নোট নিয়ে তাঁর বক্তব্যে হ্যাঁ বোধক সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন । আশা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর অন্তত আমাদের ভাগ্য বদল হবে। ‌ সংবাদপত্রে প্রণোদনার বিপরীতে আমাদের ন্যায্যতম হিস্যা পাবো। ‌ কিন্তু কে শোনে কার কথা!
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেও ঢাকার বাইরে নির্বাচিত নেতৃত্ব থেকে মনিটরিং সেলে আমাদের প্রতিনিধিত্ব হয়নি ! একইদিন আমার প্রস্তাবনায় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টেও ঢাকার বাইরের সাংবাদিক প্রতিনিধিত্ব চেয়েছিলাম। তাও প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে কথাও রাখেননি দায়িত্বশীল কেউ’ই।

একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, একদিন সবাই সবকিছু ভুলে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়ন করা যাদের দায়িত্ব, তাদের কাজকর্ম সাংবাদিকরা মনিটরিং করছেন। একদিন নিশ্চয়ই এর পোস্টমর্টেমও হবে। একথা আমাদের মানতেই হবে যে, পদ পদবী কিংবা চেয়ার কারোরই স্হায়ী নয়।

যাক প্রণোদনার কথাতেই ফিরে আসি। প্রণোদনা চেয়ে এডিটর গিলডস ছয় দফা দিয়েছে । সাংবাদিকদের এ নিয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা স্বাগত জানানোর বদলে উদ্বেগ’ই দেখা দিয়েছে। দাবি উঠেছে, গণমাধ্যমে অতীতে দেয়া প্রণোদনা কার ভাগে কিরকম গেছে, তা খতিয়ে দেখার। ‌তা খতিয়ে দেখতে সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ শীর্ষ সংগঠন বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সভাপতি মোল্লা জালাল ‘কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা খুবই বিবেচনা যোগ্য। মালিকদের প্রণোদনা নিয়ে আওয়াজ তোলাদের ‘মতলববাজ’ আখ্যায়িত করেছেন মোল্লা জালাল।

ফেসবুকে নিজের ওয়ালে আপলোড দেয়া মন্তব্যে তিনি লিখেছেন, ‘মতলববাজদের পাঁয়তারা আঁচ করতে পেরে গত ২৯ মার্চ বিএফইউজে এবং ডিইউজে এক যুক্ত বিবৃতিতে করোনার এই আপদকালে অবিলম্বে গণমাধ্যম কর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করার জোর দাবি জানায়। এতে মতলববাজরা বুঝে ফেলে, সাংবাদিকদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করা সহজ হবে না।

বিএফইউজে সভাপতি আরো লিখেছেন, ‘আমি প্রনোদনার বিপক্ষে নই। তবে কথা আছে। কেন এবং কার জন্য এই প্রনোদনা?

‘বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ করোনা সনাক্ত হয়েছে। ১০ মার্চ থেকে সরকার সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। ২৬ মার্চ থেকে সকল সরকারি- বেসরকারি অফিস আদালত ছুটি ঘোষনা করা হয়। আজকে ৩০ মার্চ। এর মধ্যে সময় গেছে মাত্র ৪ দিন। সমাজের দিনমজুররাও মহামারির এই দূঃসময়ে ৩/৪ দিনের মাথায় খাদ্যের জন্য অন্যের কাছে হাত পাতেনি।’

প্রশ্ন হচ্ছে, গণমাধ্যম মালিকদের কাছে কি ২/৪ মাস চলার মত টাকা নাই ? নিশ্চয়ই আছে , কিন্তু দেবে না। ‘ এই শীর্ষ সাংবাদিক নেতারও প্রশ্ন, ‘প্রনোদনা কি শুধু তেলের মাথায় তেল দেওয়ার জন্য? নাকি সারাদেশের সকল গনমাধ্যমের জন্য! সেটাও পরিষ্কার নয়।

গণমাধ্যম হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা যখন সরকারের আইন মানেনা, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বলতে হয়, “আমরাতো দিয়েছি, কিন্তু মালিকরা ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন না করলে কি করবো”।

বিএফইউজের সভাপতি তাই সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘এবার যখন মালিকরা প্রনোদনা চায়, তখন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়সহ মাননীয় প্রধামন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, এই সুযোগে একটি কমিশন গঠন করে দেখুনতো কে কত সুবিধা ভোগ করে আর বিনিময়ে তারা সংবাদ কর্মীদের বেতন-ভাতা ঠিকমত দেয় কিনা। এ প্রশ্নের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এদেশের সংবাদ কর্মীরা গণমাধ্যমের জন্য প্রনোদনার মতলববাজির পাঁয়তারার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।”

জাতীয় দুর্যোগে প্রধানমন্ত্রী যখন বেসরকারিখাত ও ব্যক্তি পর্যায়ে বিত্তশালীদের সমাজের দুস্থ নিরীহ রিক্ত নিঃস্ব মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, তখন গনমাধ্যম শিল্পে সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও টেলিভিশন মালিকদের বিত্তের সাথে চিত্তের মিল-অমিল, অবস্থান খতিয়ে দেখার দাবি উঠতেই পারে।

এই কথা তো সবাই জানেন যে, তথ্য মন্ত্রনালয়ের দেওয়া এ্যাক্রেডিটিশন কার্ডধারি আন্ডার গ্রাউন্ড ও ওভারগ্রাউন্ড মিডিয়া মালিকরা সহযোগী নানা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ প্রভাব, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব ছাড়াও জমি-জমা, প্লট, ব্যাংক ঋণ, বিদেশ দৌড়া দৌড়ির নন চেকিং সুবিধা সহ বহু মাত্রিক প্রনোদনা পান। বিপরীতে মাঠের সাংবাদিক কিংবা অন্য বিভিন্ন সেকশনের কর্মীরা দুর্যোগেও সুরক্ষা পান না।

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সত্ত্বেও বিত্তশালী বেশিরভাগ সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকের বোধোদয় হচ্ছে না। তারা ভুলেই গেছেন, সংবাদ কর্মীরাওতো মানুষ। তাদেরওতো জীবন-জীবিকা, পরিবার পরিজন আছে। করোনা বিদ্ধ সময়ে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালতে ছুটি ঘোষনা করে সবাইকে ‘ঘরে থাকার’ জন্য দেয়া সরকারি ঘোষনায় সৃষ্ট বর্তমানের নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থায় জীবন ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থাকা সংবাদ কর্মী ও তাদের পরিবারের খবর কয়জন পত্রিকা ও টিভি মালিক নিয়েছেন?

সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন সহ রাস্ট্রিয় নানা সুবিধা নিয়ে ওয়েজবোর্ডের ছিটেফোটাও যখন সিংহভাগ পত্রিকা মালিক সাংবাদিকদের দেন না , টেলিভিশনগুলোতে যখন ওয়েজবোর্ডের কোন নাম নিশানাও নেই, তখন মালিকদের বিশেষ কোন জোটের প্রণোদনা প্রস্তাবে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন কিংবা আপত্তি উঠতেই পারে। নিঃসন্দেহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রিয় তথ্যমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীলরা এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে দেখবেন।

লেখক: রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।
সহ-সভাপতি, বিএফইউজে- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পেশাজীবী-নাগরিক সংগঠক।

“পাঠকের কলাম” বিভাগের সকল সংবাদ, চিত্র পাঠকের একান্ত নিজস্ব মতামত, এই বিভাগে প্রকাশিত সকল সংবাদ পাঠক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। তাই এ বিভাগে প্রকাশিত কোন সংবাদের জন্য পাঠক.নিউজ কর্তৃপক্ষ কোনো ভাবেই দায়ী নয়।”

কোন মন্তব্য নেই