শহীদ জিয়ার ভ্যানগার্ড: অরুন প্রাতের তরুন দল ও রাজনীতির হালচাল

0

মোহাম্মদ শাহ্ নওয়াজ:
১. তীক্ষ ও গভীর ধীশক্তিসম্পন্ন ঐতিহাসিকের লেখায় বাংলাদেশের জনমানস ও জনচেতনা হয়তো ব্যাখ্যাতীত কিম্ভুদকিমাকার ও বিচিত্র হিসাবে আখ্যায়িত হবে হয়তো। কারন ভাষার স্বকীয়তা, মর্যাদা রক্ষার বায়ান্ন, সামরিক জান্তা বিরোধী উনসত্তর আর নব্বই এর গনআন্দোলন এবং রক্তস্নাত চেতনার অগ্নিবিস্ফোরনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের একাত্তর যে জাতির মানসপটে প্রতিদিন দাপিয়ে বেড়ায় সে জাতি একটি নিকৃস্টতম ফ্যাসিবাদসৃস্ট জীবনবাচাঁনো দায় এমন সাপোক্যাটিং পরিবেশে টান টান সিনায় রুখে দাঁড়ানোর পরিবর্তে “ লজ্জাবতী লতা”র মতো নেতিয়ে পড়বে, “ললাটের অমোঘ লিখন” বলে দীর্ঘমেয়াদী হাইবারনেশনে গিয়ে হাপিত্যেশ করে জীবনের ঘানি টেনে যাবে এটা অন্তত: কোন ইতিহাসবিদের হিসাবে মিলার কথা নয়।

২. ভাষাগত সাযুস্য, পাললিক বদ্বীপের অনন্য ভৌগলিক গঠন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের একক ধর্মীয় বিশ্বাসের রকসলিড গাঁথুনীতে ঋদ্ধ, একই ভাষা ও সংস্কৃতির চমৎকার মেলবন্ধন, নৃতাত্বিক ও শারিরীক গঠনগাঠন, সর্বোপরি একই জাতীয়তাবোধের অনন্যসাধারন ঐকতান মিলে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বিশ^ মানচিত্রে একটি গর্ব করার মতো রেয়ার নেশন স্টেট। জাতীয় ইতিহাসের সোজাসাপটা গতিপথ আর নানা বাঁকে বাঁকে অগুনিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিবসের উপস্থিতি সত্বেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিহাস পরিবর্তকারী গাঁঢ অন্ধকার রাতের প্রবল অস্তিত্বও আমাদের আস্টেপৃস্টে বেধেঁ রেখেছে।
দুর নিকট অতীতে চোঁখ ফেরালে দেখা যাবে স্বাধীন বাংলাদেশে অনেকগুলো গুরত্বপূর্ন পটপরিবর্তনকারী ঘটনা ঘটেছে রাতের অন্ধকারে। এ পরিবর্তন অনেকের দৃস্টিতে ভীষন প্রত্যাশিত, অনশ্যম্ভাবী ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনাকারী আবার অনেকের কাছে চরম দু:খজনক ও অপ্রত্যাশিত। সময়ের ম্যাচুউরিটি কাল শেষ হলে জাতির অর্জন আর কালক্রম পরীক্ষাশেষে বোদ্ধা ইতিহাসবিদরা এ ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আর ফলাফল নিয়ে মতামত দেবেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট, ৩ ও ৭ নভেম্বর, ৮১ এর ৩০ মে উল্লেখ করার মতো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে সেসময়কার পঞ্জিকার দিবাগত রজনীতে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের পূর্বরাতে এ জাতি আরো একটি ন্যাক্কারজনক , নির্লজ্জ ঘটনার স্বাক্ষী। প্লেটো, সক্রেটিস আর এ্যারিস্টটলের তত্বীয় ও সীমিত প্রয়োগের যে গনতন্ত্র হাজারো বছরের ইতিহাসের বাঁক, রাজপথ গলিপথ পেরিয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা আর নেতিবাচকতা সত্বেও সর্বোৎকৃস্ট শাসনপন্থা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে সে গনতন্তের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের পূর্বরাতে অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর কালো রাতে। জাতিকে তার শাসককূল নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগের আমন্ত্রন জানানো হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর এর দিন। রাতে নয়। জনগনের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে আয়োজিত নির্বাচনের নামে একটি মহাশঠতা ও প্রতারনার আশ্রয় গ্রহন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার ও তার বশংবদ নির্বাচন কমিশন নামক সাংবিধানিক প্রতিষ্টানটি। সে রাতে ভোটের মুন্ডা থেকে ব্যালট ছেড়া হয়নি , একএকটি ব্যালট যেন জাতির আব্রু । আর ভয় ত্রাসের মূখে জোর করে এক একটি ব্যালট নয়, জাতির আব্রু ছিড়ে ইজ্জত হরন করা হয়েছিল। ২৯ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকার ক্রমশ: প্রলম্বিত হচ্ছে, নিকশ গাঢঁ অন্ধকার দেশ ও জাতির যেটুকু আলোকরশ্নি অবশিষ্ট ছিল তা গিলে খাচ্ছে। শাসনের নামে মাৎস্যন্যায়, দুর্বিনীত লুটপাটের মচ্ছব, খুন-গুম, খালে-বিলে-ঢোবায় সবুজ শষ্যক্ষেত-নন্দনকাননে বেওয়ারিশ পচাঁ লাশের উৎকট গন্ধ , উৎসবে মাতোয়ারা ধর্ষক বাহিনীর ্উদ্বাহু নৃেত্যর মধ্য দিয়ে এ গাঁঢ অন্ধকার ক্রমশ: ঢেকে ফেলছে জাতির অমিত সম্ভাবনার নীলাকাশ।
স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার নাম করে ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথ নিস্কন্টক করতে পিলখানা হত্যাকান্ডসহ শত্রুপক্ষের অনেককে গুম-খুন, ইচ্ছেমত সংবিধান পরিবর্তন করে পুরো খোলনলছে পাল্টে ফেলা, মিডিয়া-বিচারালয়-আমলাতন্ত্র- সামরিক-আইন-শৃংখলা, বনিকশ্রেনী আর কথিত বুদ্ধিবাহিনীসহ রাস্ট্রের সকল প্রতিস্টান কব্জা করা হয়েছে।
Power corrupts- but absolute power corrupts absolutely (ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্থ করে কিন্তু সর্বময় ক্ষমতা সর্বব্যাপি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করে) এ বিখ্যাত উক্তিটি যুগাধিককাল রাস্ট্র ক্ষমতা কারায়ত্তকারী এ সরকারের জন্য বড় বেশী প্রযোজ্য। দুর্নীতি, খুন,গুমের সুরাহা, সংবিধান নিয়ে দুই নম্বরী, মুদ্রস্ফীতি, শেয়ার বাজার, অর্থনীতির মন্দাবস্থা, দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি, এসব হয়তো কালের ধারায় পুষিয়ে নেয়া যাবে কিন্তু দলতন্ত্র, দীর্ঘমেয়াদী একদলীয় শাসন আর নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার পররাস্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশের যে ক্ষতি করা হল, সুদীর্ঘকালের সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধায় ভর করে গড়ে উঠা সমাজকাঠামোর ফেব্রিক্স ছিড়ে তছনছ করে ফেলার ক্ষতি তো কোনভাবেই পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। ক্ষমতার পালাবদলের চাইতে প্রত্যেক দেশপ্রেমিকের কাছে এটাই সবচেয়ে উদ্বেগ আর গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদগ্ধজনের নিশ্চিত মতামত – কালুরঘাট থেকে “ আমি মেজর জিয়া বলছি” এর মতো জীবনবাজী রাখা অকুতোভয় মুক্তি সংগ্রামের আহ্বান আর ৭৫ এর ৭ নভেম্বর রাতের অন্ধকার ভেদ করে নিস্কলুষ পবিত্র ভোরের মোলায়েম আলোয় দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতার মিলিত হুঙ্কার বিনে এ অন্ধকার থেকে মুক্তির কোন সোজাসাপটা পথ খোলা নেই।

৩. বিশ্ব ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাসে মিলিটারী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা রাস্টনায়কদের মধ্যে জিয়াউর রহমান একজন অমিততেজ সাহসী মিলিটারী স্ট্রাটেজিস্ট কাম সাকসেসফুল স্টেটসম্যান হিসাবে অনন্য স্থান দখল করে আছে নি:সন্দেহে। ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম আর ৭৫ পরবর্তী পাচঁ বছরেরও কম শাসনকালের প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর সফলতা ও দূরদর্শিতা দেশীয় কঞ্জুস, দলকানা বুদ্ধিজীবিদের লেখনীতে ততোধিক স্থান না পেলেও বিদেশের নামকরা লেখকেরা তাদের লেখনীতে ঠিকই বিধৃত করেছেন। জিয়ার সবচেয়ে বড় গুন হচ্ছে খাঁটি দেশপ্রেম, সাহস, সততা আর মাটি ও মানুষের প্রতি দৃঢ় অঙ্গিকার। স্বাধীনতা পরবর্তী হত্যা, দুর্নীতি, বিশৃংখলা ও বিভক্তির অতল গহ্বরে ধাবমান দেশকে যেভাবে পরম ধৈর্য্য আর দুরদর্শিতা দিয়ে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন তা বিস্ময়কর। পরম ডান-বাম-মধ্যপন্থী থেকে রাজনীতি বিমূখ বুদ্ধিজীবি-পেশাজীবিদের সরকার ও দলের নেতৃত্বে সমাসীন করে বহুদলীয় গনতন্ত্র ,উৎপাদনের রাজনীতি আর জাতীয় ঐক্যের ঐক্যতানে সম্মূখবর্তী অগ্রগতির উম্মেষ গঠিয়েছিলেন। যুদ্ধ নয় শান্তি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ নয় -বোঝাপড়ার মিশন নিয়ে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁর প্রো-এ্যাকটিভ পদচারনা ছিল একজন তারকা রাস্ট নায়কের মতো। আর এ কারনে ৪০ বছরাধিককাল ধরে প্রতিপক্ষের অবিরাম খিস্তি-খেউড়, হিংসা উগড়ে দেয়া অবিরাম প্রপাগান্ডা আর চরিত্র হননের অপ্রপ্রয়াস সত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া এখনো নাম ভূমিকায়। আর এ কারনেই কাউকে কাউকে পদায়িত-সংজ্ঞায়িত করার অহর্নিশ গলদঘর্ম প্রচেস্টা সত্বেও জিয়ার টাওয়ারিং পার্সোনালিটি আর এভারেস্ট উচ্চতার জনপ্রিয়তা-গ্রহনযোগ্যতাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। দেশ-জাতি, ধর্মীয় আর জাতিগত স্বকীয়তা, জিয়া, তাঁর দল, দেখানো পথ, ধারনকৃত মতকে ভালবেসে যারা রাজনীতি করেন তাদের সস্তুস্টি আর গৌরবের জায়গা কিন্তু এটি-ই।
স্বাধীনতার ঘোষনা, মুক্তিযুদ্ধে অবদান, বহুদলীয় গনতন্ত্র পূন:প্রতিষ্টা, উৎপাদনের রাজনীতি এমন একেকটি কিংবা একাধিক বিষয়কে জিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান হিসাবে মূল্যায়িত করলেও আমার দৃস্টিতে শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”। এটি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি এ জাতির স্বাধীন-স্বতন্ত্র পরিচয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাঁর প্রবর্তিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এ ভূমি, এ জাতির স্বাধীন সত্বা আর জাতিগত স্বকীয়তা অক্ষুন্ন রাখার, সার্বভৌম চেতনা রক্ষার অবিকল্প গ্যারান্টি।

৪. জিয়ার একটি অনন্য বৈশিষ্ট ছিল তিনি মেধা আর সততার মূল্যায়ন করতে কূন্ঠাবোধ করতেন না। পুরোনো , সেকেলে ধ্যান-ধারনায় মত্ত পড়তি বয়সী কিংবা বুড়োদের চাইতে মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বিজয়ের চেতনায় দেদীপ্যমান যুবক-ছাত্রদের দেশ-জাতি পূনর্গঠনের মিশনে সামনের সারিতে নিয়ে এসেছিলেন। একটি মেধানির্ভর সুসভ্য জাতি গঠনে নানা পদক্ষেপ গ্রহনের পাশাপাশি খালকাটাসহ উৎপাদনের রাজনীতির নানা পর্যায়ে ছাত্র-যুবকদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। মূল দলের পাশাপাশি নানা শ্রেনী-পেশার সংগঠনিক উইং প্রতিষ্টা করলেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ছিল তাঁর দেশ-জাতি পূনর্গঠন মিশনে স্বপ্নের ভ্যানগার্ড। একঝাক মেধাবী , নেতৃত্বের গুনাবলীসম্পন্ন ছাত্রদের সংগঠিত করে ছাত্রদলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্ব সাজিয়েছিলেন। বিভিন্ন উদ্দীপনা-প্রনোদনামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তৎকালীন সেরা বুদ্ধিজীবি-কবি-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করে নির্বাচিত ছাত্রদের ব্যাচে ব্যাচে মতবিনিময়-প্রশিক্ষন দিয়ে আগামীর জাতীয় নেতৃত্ব তৈরীর সুদুরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। জাতীয় মানস আর দ্রোহের কবি নজরুলের “ অরুন প্রাথের তরুন দল” এর আদলে যে ছাত্রদলের স্বপ্ন শহীদ জিয়া দেখেছিলেন আজকের ছাত্রদল কি সে স্বপ্ন ধারন করে? স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে অকুতোভয় নেতৃত্ব , মায়ের মমতা আর অকৃত্রিম স্নেহাশীষে গড়ে তোলা সেদিনের ছাত্রদল শহীদ জিয়া আর বেগম খালেদা জিয়ার প্রদর্শিত পথে কি আজকের ছাত্রদল এখনো অগ্রসরমান? মেধা আর শিক্ষার কোন স্তরের ছাত্ররা আজ ছাত্রদলের নেতৃত্বে সমাসীন? আজকের ছাত্রদল কি বুঝতে সক্ষম যে , দীর্ঘমেয়াদী শিঁকড় গেড়ে বসা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে হলে অর্গলভেদী সংগ্রামের পাশাপাশি মেধা আর যুক্তির কোন বিকল্প নেই। আজকের ছাত্রদল কি এ কথা বুঝতে সক্ষম যে, শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ১৯-দফা যুগান্তকারী কর্মসূচি, সততা আর উৎপাদনের রাজনীতি এ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মননে-মগজে ইনজেক্ট করাতে হলে লক্ষ-কোটি যুবক-ছাত্রদের মেধা আর ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব দিয়ে সংগঠিত করতে হবে। অছাত্র , শিক্ষা প্রতিষ্টান থেকে ছিটকে পড়া , বই-খাতা-ক্যাম্পাসের সাথে সস্পর্কহীন, বয়সের ভারে ন্যূয়ে পড়া, নানা অপকর্ম-অপরাধে জড়িত আর দাস্পত্য জীবনের সুখ-বিলাস কিংবা নানা দহনে দগ্ধ কথিত ছাত্রনামধারীদের নিয়ে ছাত্রদল তার গৌরবোজ্জল সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনতে সক্ষম? বর্তমান ছাত্রদল নেতৃত্ব কি শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, স্বাধীন পররাস্ট্রনীতি, দেশ-জাতির প্রতিটি ক্রন্তিলগ্নে, সংকটে-সংগ্রামে শহীদ জিয়ার অবদান সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত? তারা কি কখনো তাঁর স্মৃতি বিজড়িত জিয়া যাদুঘরে সংরক্ষিত রাজনৈতিক ফুটনোট, দৈনদ্দিন পরিকল্পনা , সাদাসিদে জীবনযাপন আর খাবার মেন্যু কখনো স্টাডি করার ফুরসত পেয়েছেন? আজকের ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কি কবি আল মাহমুদের লেখনীতে উঠে আসা “ তৃষিত জলধী”র দেশ ও জাতির অমিত অর্থনৈতিক সম্পদ-সম্ভাবনা নিয়ে মধ্যরাতে বঙ্গোপসাগরের বক্ষে ভাসমান হিজবুল বাহারের উম্মূক্ত ডেকে সুবিশাল আকাশের আধো-অন্ধ ছায়াতলে উদ্বিগ্ন -ধ্যানমগ্ন জিয়াকে কখনো বুঝতে উদ্যোগী হয়েছেন?

আজকের ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কি কখনো পাঠচক্র আয়োজন করে নিজেদের বোঝাপড়ার স্তর ঋদ্ধ করার চেস্টা করছেন যে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব ম্ঈন-ফখরেরা কার ক্রীড়নক হয়ে, কী ধরনের কু-পথ-পন্থায় জাতির জন্য আরেকটি পলাশীর আম্রকানন বানানোর প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিলেন? কেন কোন সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাস্ট্রীয় পদ-পদবী ধারন না করা সত্বেও ভারত সফররত জেনারেল মঈনকে পরক্রমশালী সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সমান মর্যাদা দিয়ে তৎকালীন ভারত সরকার বরন করে নিয়েছিলেন আর ব্রেজনেভ ব্যতিত আর কোন সফরকারী প্রেসিডেন্টকে দেয়া হয়নি এমন উচ্চ প্রজাতির ছয়টি মূল্যবান ঘোড়া ভারত সরকার জেনারেল মঈনকে উপহার দিয়েছিলো ?
ইতিহাসের এ ক্রুশিয়াল চ্যাপ্টারগুলো ছাত্রদলকে জানতে-বুঝতে হবে। নচেৎ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী শহীদ জিয়া আর একটি মাত্র শব্দ “ না” বলে স্বৈরাচারকারকে ধারশায়ীকারী সংগ্রামের প্রতিক বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের মশাল নিয়ে ছাত্রদল এগুনোর শক্তি হারিয়ে ফেলবে একথা বর্তমান অবস্থাদৃস্টে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায়।

শহীদ জিয়াকে , তাঁর ভিশন, দর্শন বোঝার জন্য কবি আল মাহমুদের “ডানাঅলা মানুষ” কবিতার ক’টি চরন উল্লেখ করতেই হয়-
“ আমি তো পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের দরিদ্রতম মানুষ। একজন ডানাঅলা কবি? ডানা? —–
“একদা এই ক্ষুধার্ত দেশের এক অদৃশ্য ডানার হতভাগ্য প্রেসিডেন্টের সাথে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিল সমুদ্রে। গভীর রাতে। বঙ্গোপসাগরের চলমান এক বিশাল জাহাজের মাস্তুুলের কাছে।
আমি বললাম, মহামান্য প্রেসিডেন্ট, আপনি এখন কী খুঁজছেন? আপনার ঘুম পায় না?
-আমি তেল খুঁজছি। দেখতে পাচ্ছো না?
তরঙ্গের নিচে আমাদের জন্য তেলের শিরা বইছে?
তুমি কতদূর দেখতে পাও, সামনে তাকাও
যতদূর দেখা যায় সবটাই বাংলাদেশ।
আমি অভিভূত হয়ে বললাম, মিস্টার প্রেসিডেন্ট,
মনে হয়, আপনি আমার মতোই উড়তে পারেন। কিন্তুু আপনার ডানা কই? ডানা দেখছি না কেন?
-আছে। দেখো সমুদ্র তরঙ্গের মতো তা লাফিয়ে উঠে, আর আকাশের মত নীল। ঘাতকের ভয়ে তা লুকিয়ে রাখি আড়ালে কেউ দেখতে পায় না।
আবার তাকে দেখেছিলাম আরেক সমুদ্রে। জনসমুদ্রে। মানুষের মিছিলের লবণাক্ত দরিয়া ছিলো সেটা। তরঙ্গ উঠেছিল মানুষের হাতের। একটা কামানধারী গাড়ীতে তার কফিন ফুলের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আমি তার ডানা দুটির কী হলো-খোঁজ করতে মধ্য সমুদ্রের মধ্যে নেমে গেলাম।
নামলাম ঘাম আর চোখের জলের দরিয়ায়। কই সে ডানা যা আকাশের মতো নীল আর ঢেউয়ের মতো লাফিয়ে উঠে বাতাসে?

৫. ছাত্রদলের আজকের অবস্থা -দুরাবস্থা যাই বলি না কেন তার জন্য অভিভাবকেরা তাদের দায় এড়াতে পারবেন না। একটি সুসংগঠিত-সম্ভাবনায় ভরপুর একটি সংগঠনকে ব্যক্তি আর গোষ্ঠিস্বার্থে কব্জায় নিতে খেলাধূলা করলে যা ঘটার তাই ঘটেছে। শহীদ জিয়া, বেগম জিয়া আর তারেক রহমানের স্বপ্নের এ ভ্যানগার্ডকে সোনালী অতীতে ফিরিয়ে আনতে হলে নিম্মোক্ত বিষয়গুলো ভেবে দেখা দরকার:
ক. মেধাবী, ভালো চারিত্রিক বৈশিস্ট্যসম্পন্ন প্রকৃত ছাত্রদের রিক্রুট ও নেতৃত্বে আনতে হবে।
খ. পরিকল্পিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষনের উদ্যোগ থাকতে হবে।
গ. এলাকা ভিত্তিক কমিটি নয়, শিক্ষা প্রতিষ্টান-ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক কমিটি গঠন করতে হবে।
ঘ. উপঢৌকন, বিনিময়, লেনদেন , আত্মীয়-স্বজন পূনর্বাসন এসব অপকলাচার পরিহার করে ত্যাগী কর্মীদের দিয়ে কমিটি করতে হবে।
ঙ. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় সাধারন ছাত্রদের সংগঠনে অন্তর্ভূক্তির জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।

লেখক:- সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক ব্যুরো প্রধান, বাসস, চট্টগ্রাম ও সাবেক সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেড়ারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)।

কোন মন্তব্য নেই