জাতীয় কবি কাজী নজরুলের জন্মবার্ষিকী আজ

0
.

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এইদিনে পশ্চিমবাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। আসলে দুখু মিয়া ছিলেন বাংলার দামাল ছেলের প্রতীক। কবির বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা।

তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিণী সৃষ্টি করে বাংলা সংগীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।

জাতীয় কবির ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। : বাণীতে কাজী নজরুল ইসলাম দেশে দেশে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অনমনীয় প্রতিবাদী ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কবির জন্মবার্ষিকীর দিনটি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় উদযাপন করবে। নজরুলের প্রেম, বিয়ে-বিচ্ছেদ, গ্রেফতার, সমাবেশ এবং কাব্য ও সংস্কৃতিচর্চাসহ বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী কুমিল্লা। এই কুমিল্লা জেলার দৌলতপুরে সৈয়দা খাতুন নামে এক কিশোরীকে তিনি ভালোবেসেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ‘নার্গিস’।

.

১৯২১ সালে নির্ধারিত বিয়ের দিনটিতেই তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। নার্গিসকে নিয়ে তিনি লিখেন ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই/কেন মনে রাখো তারে।’ এই শহরেই এখনো কবির অনেক স্মৃতি বহমান। নজরুলের স্ত্রী প্রমীলার বাড়িও এখানে।

বাংলা কবিতায় নজরুলের আবির্ভাব একেবারেই ধূমকেতুর মতো। হঠাৎ করে একদিন তিনি বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়ে সমস্ত আকাশকে কিভাবে রাঙিয়ে গেলেন অথবা উজ্জ্বল করে দিলেন তা নিয়ে এখনো গবেষণা হতে পারে। কোন সঞ্জীবনী মন্ত্রে তিনি উচ্চকন্ঠে বলতে পারেন বল বীর, বল উন্নত মম শির অথবা মহাবিদ্রোহী রণকান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দলরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মানবতা ও প্রেমের কবি।

কখনো তিনি ছিলেন শান্তির বার্তাবাহক। তিনি পরাধীনতা, শোষণের কবল থেকে জাতিকে প্রথম স্বাধীন ও মুক্ত হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। যার প্রত্যয়ী ও বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে মানুষকে মুক্তিসংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছেন। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন।

এছাড়া ওই অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। পরে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এ সময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙ্গার গানের মতো কবিতা, ধূমকেতুর মতো সাময়িকী। এতে করে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।

.

জেলে বন্দি হলে পরে লিখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী।’ এসব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, যেন সকাল-সন্ধ্যায় মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’ কবির এ গানের কথা স্মরণে রেখে মৃত্যুর (১৩৮৩ সালের ১২ ভাদ্র) পর তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। আজ তাঁর সেই অন্তিম শয্যা ছেয়ে যাবে অগণিত অনুরাগীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুলে ফুলে। : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে।

এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑ কবির মাজারে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, র‌্যালি, স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও কুমিল্লার দৌলতপুরে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে টেলিভিশন ও রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাণী : কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মধ্যে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মন্ত্রণা সুস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল বুধবার এক বাণীতে তিনি এসব কথা বলেন। বেগম খালেদা জিয়া বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করি এবং তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত প্রাণপুরুষ। শত জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। নিজেও অত্যাচার সয়েছেন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর। পারিবারিক সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও নির্বাক হওয়া পর্যন্ত সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের কর্মসূচি : আজ ২৫ মে বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) উদ্যোগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। উক্ত অনুষ্ঠানে জাসাসের সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত কবির মাজার প্রাঙ্গণে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। : নজরুল একাডেমিতে নজরুল জন্মবার্ষিকী পালন

দেশের প্রাচীনতম বেসরকারি নজরুল চর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল একাডেমি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশে কাজী নজরুলের আগমনের ৪৫ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়। প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন শিক্ষক ও শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী। অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক ও সাংবাদিক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুরকে নজরুল চর্চা ও নজরুল একাডেমির অগ্রযাত্রায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নজরুল একাডেমী সংবর্ধনা ২০১৭’ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নজরুল গবেষক ও একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মিন্টু রহমান। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি, শিক্ষাবিদ, লোকবিজ্ঞানী, নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং নজরুল একাডেমির সভাপতি ড. আশরাফ সিদ্দিকী।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা নববর্ষের উদ্বোধনী সঙ্গীত ও নজরুল একাডেমির থিম সঙ একে অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি দিনে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় নজরুল একাডেমির পক্ষ থেকে জাতীয় কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ করা হবে। বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে জাতীয় কবির জন্মদিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই