বৃটেনে বাঙ্গালীদের ভিন্ন ভিন্ন রূপ: ভোট, ক্রিকেট ও ডিম ছোড়াছুড়ি

0
এম মাহাবুবুর রহমান।

মাত্র এক সপ্তাহে তিন চেহারায় বাংলাদেশীদের দেখছে বৃটেন। ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত তিন কন্যার এমপি নির্বাচিত হওয়ার সেলিব্রেশন চলছে গত ক‘দিন ধরে। আর টাইগারদের আইসিসি ক্রিকেটে সুনাম কুড়ানোর আনন্দ-উত্তেজনা চলছে জোরেশোরে। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২৪ ঘন্টার লন্ডন সফরে বিক্ষোভ-উত্তেজনা ছড়িয়েছে কমিউনিটিতে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বৃটেনে ভোট, ক্রিকেট আর ডিম ছুড়াছুড়ির প্রতিযোগিতায় অংশ নিল বাংলাদেশীরা।

.

আগামীকাল বৃহস্পতিবার বার্মিংহামের এজবাস্টনে আইসিসির সেমিফাইনালে খেলবে টাইগাররা। বিশ্ব ক্রিকেট আসরে এটাই বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাপ্তি। ১৭ কোটি বাংলাদেশীর মতো বৃটেন প্রবাসীদের মধ্যেও তাই চলছে ব্যাপক উত্তেজনা। ফাইনাল খেলা এবং কাপ জেতার প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা।

এদিকে, গত ৮ জুনের বৃটেনের জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত তিন কন্যা পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। এতে বাংলাদেশীরা অনেক খোশ মেজাজে আছেন। লেবার দলীয় এমপি হওয়ায় এ খুশির মাত্রা যেন একটু বেশী-ই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্রী টিউলিপ সিদ্দিকীর এমপি নির্বাচিত হওয়া নিয়ে আগেরবার যুক্তরাজ্য বিএনপির বিরোধিতা থাকলেও এবার তারা ছিল নিরব। ‘মাইগ্রান্ট‘ হিসেবে অধিকাংশ লেবার সমর্থক বাংলাদেশী (বিএনপি-জামায়াত নির্বিশেষে) টিউলিপেরও পক্ষে ছিলেন। যুক্তরাজ্য বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ভবিষ্যতে আরো বেশী বাংলাদেশী এমপি বৃটেনের পার্লামেন্টে যাতে যেতে পারে, সেজন্য একসঙ্গে তারা কাজ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃটেনের রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে পারলে প্রবাসীদের লাভের বিষয়টিকে তারাও মানছেন।

কিন্তু, এমন আনন্দঘন সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বল্প সময়ের জন্য লন্ডন সফর করছেন। সুইডেনের পথে ২৪ ঘন্টার যাত্রাবিরতি। সঙ্গে ভাগ্নির বিজয় উদযাপন। আর এই বিজয় উদযাপনেই বৃটেন প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে দেখা দেয় তীব্র উত্তেজনা। বাংলা রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা ছুটে যান বিমানবন্দরে। কেউ কেউ শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান, আর অন্যরা কালো পতাকা দেখান। গাড়িতে ডিম ছুড়ে মারেন। এমন পরিস্থিতি এড়াতে এবারো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য লন্ডনে একাধিক হোটেল বুকিং দেয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের ফাঁকি দিতে তিনি লন্ডনের বাইরে দক্ষিণ বাকিংহামশায়ারে একটি হোটেলে উঠেন।

গত দু‘দিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত হোটেল নিয়ে নানাবিধ কানাঘুষা ছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও শেষ মূহুর্তে হোটেলের তথ্য জানতে পান। অবশ্য যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ বলেছেন, লন্ডনের বাইরে হলেও দক্ষিণ বাকিংহামশায়ারে এই হোটেলেই গতবছর উঠেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারও তাঁর জন্য এই হোটেল বুকিং দেয়া হয়। এতো কৌশলের পরও বিএনপি নেতাকর্মীদের চোখ এড়াতে পারেননি তিনি। বিক্ষোভের মুখে তাকে পড়তেই হলো। আর স্বাগত জানানো এবং পাল্টা বিক্ষোভে এসে যুক্তরাজ্য আ্ওয়ামী লীগ ডিম ছুড়াছুড়ি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

.

হোটেলের প্রধান ফটকের দুই পাশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা দুপুর থেকেই জড়ো হন। প্রাইভেট বাস ভাড়া করে দু‘পক্ষ জমায়েত করেন। আওয়ামী লীগের জমায়েত গতবারের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংখ্যা বরাবরের মতোই বেশী ছিল। নেতাকর্মীরাও ছিল ক্ষুব্ধ। দু‘পক্ষই পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভের নামে অশ্লীল শ্লোগান ও ডিম ছুড়াছুড়ি করে পুলিশের সামনেই। বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রধান শ্লোগান ছিল-‘কিলার হাসিনা – গো ব্যাক- স্টেপ ডাউন‘।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেন। ‘আমার সোনার বাংলায়, তারেকের ঠাঁই নেই‘। মজার বিষয় হলো- বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো শ্লোগান ছিল না। পবিত্র রমজানে মুখে দিয়ে অনবরত শ্লোগানে তারা ‘শেখ হাসিনা এবং তারেক রহমান‘কেই মুখোমুখি করেছেন।

বরাবরের মতো বিএনপি কর্মীদের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা ছিল- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িতে একটি ডিম লাগাতে পারা। গাড়িবহরের দ্রুত ঢুকে পড়ায় কে সফল হয়েছে – এটা বিচার করার সুযোগ কারও হয়েছে বলে আমরা মনে হয় না। গাড়িবহর গেইট দিয়ে প্রবেশের সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা গাড়িতে ডিম ছুড়তে থাকে। পাল্টা বিএনপি নেতাকর্মীদের জমায়েতে ডিম ছুড়তে থাকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

তবে বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলেই নামাজে দাড়ালে আওয়ামী লীগের কর্মী নামাজরত মানুষের ওপর ডিম ছুড়তে থাকে। এতে তারেক রহমানের মানবাধিকার বিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আবদুস সালাম ও লন্ডন মহানগর বিএনপির সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশিক বক্স। নামাজরত (রোজাদার) আশিক বক্সের মুখমন্ডলে ডিম পড়লে কপাল কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ে। নামাজরত মানুষের ওপর ডিম-হামলার ঘটনা পুলিশও ভালভাবে নেয়নি। এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়ায় জানাতে গিয়ে বলেন, ‘নিজেদের ধর্মীয় কর্মকান্ডকে শ্রদ্ধা জানানোর ভদ্রতা দেখানো জরুরী। সেটা কেউ কেউ ব্যর্থ হয়েছে।‘ তবে এসময় পুলিশ দ্রুত আওয়ামী লীগের তিন-চারজন কর্মীকে আটক করে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২৪ ঘন্টার জন্য ওই এলাকায় ব্যান্ড করে তাদের ছেড়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে ডিম ছোড়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্য বিএনপির সহ-ক্রীড়া সম্পাদক শরফরাজ আহমেদ শরফু, ইস্ট লন্ডন বিএনপির নেতা সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দল কর্মী আবু তালেব সবুজকে পুলিশ আটক করে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়।

.

তবে প্রধানমন্ত্রীর এই লন্ডন সফর এবং ভাগ্নির বিজয় সেলিব্রেশনকে খারাপ চোখে দেখছেন বাংলাদেশী প্রবাসীরা। যেদিন চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বসে সেনা সদস্যসহ দেড় শতাধিক মানুষ নিহত, ঠিক সেইদিন তিনি ছুটে এলেন ভাগ্নির বিজয়কে সেলিব্রেশন করতে! সত্যিকার অর্থে নির্বাচিত কোনো প্রধানমন্ত্রী এমনটা করতে পারতেন কি-না এটা প্রশ্ন রাখাই যায়। তিনি সফর একদিন পেছাতে পারতেন। ভাগ্নির পার্টি সেলিব্রেশনের সুযোগ অনেক পেতেন। কিন্তু বাংলাদেশের এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ার দায় শেখ হাসিনা কখনো শোধ করতে পারবেন না। সেনা বাহিনীর সদস্যরা বিষয়টি বিবেচনা করছেন কি-না জানি না। তবে সাধারণ জনতা শেখ হাসিনার এমন দায়িত্বহীন আচরণকে ঘৃনাভরে ধিক্কার জানাচ্ছেন – এটা আমি নিশ্চিত।

যাই হোক, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল সরকার আসুক, এই প্রত্যাশা করি। জনগণের সরকার এলে মানুষের প্রতি দায়বোধ থাকবে। উন্নয়নশীল বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই ধীরে ধীরে উন্নত হবে, মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিশ্চিত হবে – এমন প্রত্যাশা রাখছি।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিক ও গবেষক।

“পাঠকের কলাম” বিভাগের সকল সংবাদ, চিত্র পাঠকের একান্ত নিজস্ব মতামত, এই বিভাগে প্রকাশিত সকল সংবাদ পাঠক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। তা্ই এ বিভাগে প্রকাশিত কোন সংবাদের জন্য পাঠক.নিউজ কর্তৃপক্ষ কোনো ভাবেই দায়ী নয়।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন