রওশন’স রশ্মিতে আলোকিত ফ্যাশন জগৎ

0
06
অতুলনীয় বাহারী পোষাকের জন্য রওশনস।

ফার্সি ‘রওশন’ শব্দের অর্থ ‘আলো’। প্রকৃতির সাথে যেমন আলোর সম্পর্ক, তেমনি রওশন আরা চৌধুরীও প্রকৃতির সাথে আলোর ন্যায় মিশে আছেন।

আলো ছাড়া যেমন প্রকৃতি তথা সভ্যতা অকল্পনীয় তেমনি চট্টগ্রামের তথা বাংলাদেশের মূল ধারার ফ্যাশনও অন্ধকার। ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে যার তিন যুগের পথ চলায় কোন মারিং-কাটিং ডিজাইন চোখেতো পড়েইনি বরং চোখ ধাঁধানো ডিজাইনে সব বয়সী মানুষের মন জয় করেছেন। দেশের সীমানা ফেরিয়ে রওশন’স ব্র্যান্ড প্রবাসীদেরও একটি প্রিয় নাম।

মজার ব্যাপার হলো- যে বাচ্চারা মা-বাপের হাত ধরে রওশন’স-এ জামা কিনতো তারা এখন নিজের বাচ্চার হাত ধরে রওশন’স-এ আসে কেনাকাটা করতে! বাংলার অন্য ৮/১০টি শিশুর মতোই দুধে-ভাতে বেড়ে উঠছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে নানার বাড়িতে জন্ম নেয়া রওশন আরা চৌধুরী।

13518147_1634018473583650_1148646653_o
চোখ ধাঁধানো ডিজাইনে সব বয়সী মানুষের মন জয় করেছে রওশনস।

কিন্তু বড্ড অসময়ে মা হারিয়ে তাঁর জীবনের ছন্দপতন ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে, ১৫ বছর বয়সে দুগ্ধপোষ্য শিশুর জননী হয়েও এসএসসি পরীক্ষা দেয়া। স্বামী আনিসুর রহমানের আইসিএমএ পড়াশুনার বিপরীতে নিজের পড়াশুনো চালিয়ে যাওয়া, বাচ্চা আর ঘর সংসার সামলানো। সব সামলিয়ে স্রোতের বিপরীতে হেঁটে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন আজকের রওশন’স।

কী একুশ, কী স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবস কোন অনুষ্ঠানের পোশাকে রওশন’স-এর শ্রম নেই? উৎসবে পোশাকের কাজে রওশন’স সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে। আর ঈদের পোশাকের পরতে পরতে লেগে আছে রওশন’স রশ্মি।

যার রওশনে আলোকিত ফ্যাশন জগত সেই রওশন আরা চৌধুরীর মুখোমুখিপাঠক নিউজ

পাঠক.নিউজ: কখন থেকে ফ্যাশনে জড়িয়ে পড়লেন? রওশন আরা চৌধুরী: ফ্যাশন ডিজাইনার হবো এটা কখনো ভাবিনি। আগ্রহ নিয়ে ভাই-বোনদের জন্য পোশাক তৈরী করতাম। আর আমার আব্বু সেই আগ্রহকে উসকে দিতেন অনেকগুলো কাপড় কিনে দিয়ে। নিজের মতো করে কাপড়গুলোকে দৃষ্টি নন্দন করার চেষ্টা করতাম। তখন মাথায় এলো- শুরু করেই দেখিনা, কী হয়? সেই শুরু, আর পরের গল্প আজকের রওশন’স।

003
মায়ের পাশাপাশি যাতে শিশুদের প্রয়োজনীয় পোশাক, খেলনাসহ সবই একসাথে পাওয়া যায় রওশনসে।

পাঠক.নিউজ: শুরুটাতো করলেন, কিন্তু কীভাবে?

রওশন আরা চৌধুরী: স্বামী আনিস চৌধুরী থেকে মাত্র ৮০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করলাম নারী শ্রমিক সংগ্রহ, কারখানা তৈরী। ১৯৮৫ সালে ঢাকার জিগাতলায় কারখানার সাথে প্রথম শোরুম। ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকায় নিজ বাসার ছাদে প্রদর্শনীতে অভাবনীয় সাফল্য। এই প্রদর্শনীতে প্রায় সবকটি পোশাকই বিক্রি হয়ে যায়, যা টাকার অংকে ছিল প্রায় লাখ টাকা।

’৯০ সালে লাখ টাকা মানে বিশাল অবস্থা! ১৯৯২ সালে দামপাড়া পুলিশ লাইনে রওশন’স, আর মায়ের পাশাপাশি যাতে শিশুদের প্রয়োজনীয় পোশাক, খেলনাসহ সবই একসাথে পাওয়া যায় তার জন্য ’৯৩ সালে একই ছাদের নিচে Kids Camp প্রতিষ্ঠা করি।

১৯৯৬ সালে ঢাকায় রওশন’স এর আরো একটি শোরুম চালু করি। ১০ বছর পর সেটি ছেড়ে দিয়ে কারখানা স্থানান্তর করি চট্টগ্রাম। কারন ঢাকায় কারখানা থাকা কালে কাজ তদারকির জন্য আমাকে সপ্তাহে ৩ দিন ঢাকা থাকতে হতো। রাত জেগে ডিজাইন করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম জার্নি সব মিলে অস্থির একটা সময় কাটতো।

পাঠক.নিউজ: দীর্ঘ পথ চলায় আপনার অর্জন কী?

রওশন আরা চৌধুরী: পরিশ্রম করেছি একাধারে। পরিশ্রমের বিনিময়ে পেয়েছি আস্থা, ভালোবাসা। এই ঈদেও নিয়মিত অর্ডারের মাঝে কিছু প্রবাসী পরিবারের অর্ডার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। দেশে আসছে ঈদ করবে। রওশন’স এর পোশাক ছাড়া তারা দীর্ঘ দিন কোন ঈদ কাটায়নি। মানুষের এই ভালোবাসাটাই আমার অর্জন, মূল পূঁজি।

পাঠক.নিউজ: তারা যে ভালোবাসা দেখাচ্ছে তা অনেক কষ্টের অর্জন। দীর্ঘ দিন কাজ করছেন। স্বীকৃতি পেলে কাজের গতি বাড়ে, আপনার সেই অর্জনগুলো আমাদের পাঠকদের জন্য বলুন?

রওশন আরা চৌধুরী: কখনো স্বীকৃতির জন্য মুখিয়ে থাকিনি। তবুও যখন- অনন্যা, অন্যদিন, প্রথম আলো, ভোরের কাগজ, প্রাঙ্গণ ‘এমিকন’ পুরস্কার অর্জন করি তখন ভাবি আমি সঠিক পথেই ছিলাম, আছি। মানুষের ভালোবাসা আমি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এখন কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সময় পাইনা। ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আলোর ফ্যাশন প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সারা বছরই ব্যস্ত থাকতে হয় কোন না কোন আয়োজনে।

05
দেশের সীমানা পেরিয়ে রওশন’স ব্র্যান্ড প্রবাসীদেরও একটি প্রিয় নাম।

পাঠক.নিউজ: এবার ঈদের বিশেষ আয়োজন কী?

রওশন আরা চৌধুরী: আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে, গরমে যাতে পোশাক পড়ে আরাম বোধ হয় সে আলোকে মানসম্পন্ন ফেব্রিকে হাতের কাজ করেছি। কোথাও পেইন্ট, কোথাও সুই-সুতো এক কথায় সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আমার যতটুকু সাধ্য আছে তার সবটুকুন ঢেলে কাজ করেছি।

পাঠক.নিউজ: গ্রাহকদের সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

রওশন আরা চৌধুরী: সেই সকালে শো-রুম ওপেন হয় আর সেহরীর আগ পর্যন্ত বেচা-বিক্রি চলে। বুঝতেই পারছেন সাড়াটা কেমন। বলে রাখি-রওশন’স এর গ্রাহক কিন্তু নির্ধারিত। তবুও চলমান কিছু গ্রাহকতো সব সময়ই থাকেই।

পাঠক.নিউজ: পোশাকের দামের ব্যাপারে কোন আপত্তি বা প্রশ্ন কেউ তুলেছে?

রওশন আরা চৌধুরী: না, কোন আপত্তি তোলার সুযোগ নেই। কারণ- যার বাজেট যেমন তিনি তেমন কাপড় এখানে পাচ্ছেন। আর যেগুলোর ফেব্রিক দামী সেগুলোতো একটু দামী হবেই।

পাঠক.নিউজ: নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন?

রওশন আরা চৌধুরী: চ্যালেঞ্জতো বিশাল ছিল। আমি যখন কাজ শুরু করি তখন বলা যায়- মরুভূমিতে একা একা হাল চাষ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছিলাম। সমাজ তখন অনেক রক্ষণশীল ছিল। মেয়েরা কিছু একটা করবে সেটা এই সমাজ অত সহজে মেনে নিত না। তার উপর এমন কোন আইডল ছিলনা যাকে সামনে রেখে অগ্রসর হবো। সমাজের সেই রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতে পেরেছি পরিবারের সহায়তায়। আমার পিতা, স্বামী সবাই আমার পাশে ছিল বলে তা আমার জন্য সহজ ছিল।

02
উৎসবে পোশাকের কাজে রওশন’স সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে।

পাঠক.নিউজ: আপনি অনেকের আইডল। পাঠক.নিউজের পাঠকদের জন্য একটু বলুন কোন সংগঠন বা সংস্থার সাথে জড়িত আছেন?

রওশন আরা চৌধুরী: নব্বই দশকের শুরুর দিকে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সাথে জড়িত হই। অনেক বছর যাবৎ জড়িত আছি শিশুদের সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সাথে। প্রায় ৩০ বছর কাজ করছি ভিন্নভাবে সক্ষম (প্রতিবন্ধী) শিশুদের নিয়ে। আছি রোটারিক্লাব, টিআইবি, চিন্তাশালা, ফোরাম ফর পিপলস ভয়েস’র মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে। খ্যাতিমান ডিজাইনারদের নিয়ে গড়া ডিজাইনার্স ফোরামের ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা। ভালোবাসি কবিতা, তাই জড়িত আছি আবৃত্তি সংগঠন ‘নির্মাণ আবৃত্তি অঙ্গন’র সাথে, কাজ করছি অবহেলিত মানুষের জন্য ‘সংসপ্তক’ ও ডিডিআরসি’র সাথে।

পাঠক.নিউজ: নামের প্রতি আপনি শতভাগ সুবিচার করেছেন। আপনার কর্মময় জীবন হোক সবার অনুপ্রেরণার উৎস। পাঠক.নিউজকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রওশন আরা চৌধুরী: পাঠক.নিউজ পরিবারকেও ধন্যবাদ। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে ঈদেও অগ্রিম শুভেচ্ছা।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন