জিয়া: সত্যিকারের এক মহানায়কের নাম

0
ব্রেকিং নিউজ
  •  

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

.

মোঃ সাহাব উদ্দীন হাসান বাবুঃ
আজ ৩০ মে বাংলাদেশের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী। এঅঞ্চলে রাজনীতির অঙ্গনে যেমন, শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনেও তেমন অনেক মনিষির জন্ম। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মহা প্রতিভাধর দুই মনিষি। এমন প্রতিভা শত বছরে কদাচিৎ জন্ম নেয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁরা উজ্জল নক্ষত্র। মহান স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি বাঙ্গালীর রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সংস্করণের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দেশের রাজনীতির ইতিহাসে দুই দিকপাল। তাদের প্রজন্মের জনগণের সুখ-দুঃখের পরম বন্ধু ছিলেন তাঁরা। এছাড়াও বাংলার বাঘ শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক, শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি.ওসমানী। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, সূর স¤্রাট আব্বাস উদ্দীন, হালের নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুচসহ অনেক মনিষির জন্ম এই অঞ্চলে। যাদের কর্মকান্ড নিয়ে গর্ববোধ করা যায়। যাদের প্রায় প্রত্যেকেই জনগণের কল্যাণে নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করতেন না। এমন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন যাদের জন্মে ধন্য এ দেশের মানুষ। তাদের অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। কিন্তু দেশ-সমাজ-জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায় সবাইকে ছাপিয়ে একজন মহানায়কের কর্মকান্ডই আজ সর্বাধিক আলোচিত ও অনুকরণ-অনুসরণযোগ্য। তিনি হচ্ছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
দীর্ঘদিন থেকে আমরা দেখে আসছি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, চিন্তা-চেতনা, ভাবাবেগ বিশেষ করে সবকিছু দ্বিধারায় পরিচালিত হয়। একটি হচ্ছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে অন্যটি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে আক্ড়িয়ে ধরে। একদিকে ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবধারায় পরিচালিত অপর পক্ষ সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করে ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়াকেই প্রাধান্য দেয়। এক পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে অপর পক্ষ মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামকে প্রাধান্য দেয়। মোট কথা দেশের রাজনীতির অঙ্গন দুটি বিশ্বাসে, দুটি ভাবধারায় বিভক্ত হয়ে আছে। যেহেতু স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যবধি (একবার ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রধান দুটি দলকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত সেহেতু স্বাভাবিক ভাবেই ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণও ঐ দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলে মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে, ঠিক তেমনিভাবে বিএনপি’র রাজনীতি চলে তার প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে। মুজিব-জিয়া দুই রাজনৈতিক ধারার দুই দিকপাল। যদিও আদর্শ-নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অহর্নীশ মুখোমুখী হয়ে আছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে। প্রতি নিয়তই তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের তর্কে লিপ্ত হতে দেখা যায়, এমন কী এ নিয়ে জনগণের মাঝেও কৌতুহলের শেষ নেই।

স্বাধীনতা ঘোষণা: দেশবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যানুযায়ী সময়ের বাস্তবতায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়া। কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং এই ঘোষণায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁর এ ঘোষণায় বলিয়ান হয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী জান্তাদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা, পরিক্রমা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবকিছু জিয়াউর রহমানের পক্ষেই যায়, সন্দেহাতীতভাবে জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে নেতৃত্ব: শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই জিয়া দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি শত্রুর সম্মুখ সমরে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেছেন, তিনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এবং জিয়ার নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত জেড ফোর্স বাহিনীর প্রধান ছিলেন জিয়া। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে ভূমিকা রাখায় জীবিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক “বীর উত্তম” খেতাব পান তিনি। আওয়ামী ঘরনার বুদ্ধিজীবি ও সেই মতের নেতা-কর্মীরা বারবার একটি কথা বলেন, “যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন সেই মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।” একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়া এই ক্যাটাগরিতে পড়েন। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সবসময় এক ধরণের হীনমন্যতা কাজ করে। তারা তাদের দলের লোকের বাহিরে অন্য কোন দলের বা সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ততা ও জীবনবাজি রাখা অবদান স্বীকার করতে চায় না। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস রচনায় এই চিন্তাধারা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশ গঠনে রাষ্ট্রনায়কোচিত বিচক্ষণতাঃ দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দেশের শাসন ভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বের বলিষ্ঠ ভূমিকার মাধ্যমে যে মুহূর্তে দলীয় ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল কিন্তু সে মুহূর্তে তা না হয়ে দেশ উল্টো বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিভেদের দরুণ হানাহানিতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। দেশ চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়। খাদ্য ব্যবস্থাপণায় অপরিণামদর্শী পরিকল্পণার খেসারত দিতে গিয়ে ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দূর্ভিক্ষে পতিত হয় দেশ। লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মুত্যুবরণ করেন। কলাপাতা-জাল এবং বাসন্তির সেই সময়কার স্মৃতি দূর্ভিক্ষের ভয়াবহতা আজও মানুষের মনকে নাড়া দিয়ে যায়। সেই সময়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ৭ কোটি কম্বল এসেছিলো কিন্তু তৎকালীন প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় লুটেরা নেতাদের খাই খাই মনোভাবের জন্য কম্বলগুলো সঠিকভাবে বন্টন করা সম্ভব হয় নি। যা নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয় “৭ কোটি মানুষ, ৭ কোটি কম্বল এসেছে আমার কম্বল কই- মানুষ পায় সোনার খনি আমি আছি চোরের খনি লই।” ৭৫ পরবর্তীতে সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়ে জিয়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সুদূর প্রসারী চিন্তা চেতনা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিতে থাকেন। এ সময় তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশ তলাবিহীন ঝুঁড়ির অপবাদ গুছিয়ে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। যার ফলে দেশ গড়ার অবদানে জিয়ার ক্যারিশমার কাছে অন্যরা যোজন যোজন পিছিয়ে পড়েন।

বহু দলীয় গণতন্ত্রায়নে জিয়ার অবদানঃ ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মাত্র ১৩ মিনিটে একদলীয় বাকশাল গঠন করা হয়। কালো আইন করে বাকশাল গঠন করার মাধ্যমে অন্য সব দলতো নিষিদ্ধ করা হয়েছিলই এমন কী আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর চেয়ে দু:খজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান বহু দলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে রাজনীতিকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। জনগণকে তাদের কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এমন কী জিয়াউর রহমানের অনুমতি নিয়েই বর্তমান আওয়ামী লীগ আবার নতুন করে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ডাকসাইটের নেতা সাবেক স্পীকার আবদুল মালেক উকিল ও আজকের সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীকে দিয়ে দরখাস্ত করিয়ে নিয়ে জিয়াউর রহমান নিজ উদ্যোগে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ ফিরিয়ে দেন। দেশের রাজনীতিতে পুনরায় আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করেন। একারণেই যদি জিয়াকে আওয়ীমী লীগের বর্তমান সংস্করণের পুনর্বাসনকারী বা অনুমতিদাতা বা উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় তাহলে অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। একারণে জিয়াউর রহমানের কাছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ জিয়া যদি অনুমতি না দিতেন তাহলে আজকের এই আওয়ামী লীগ রাজনীতির ময়দানে থাকতো না। আজকের আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭৫ পরবর্তী ঘটনা-পরিক্রমার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা ছিলো। সেই বাধা অপসারণ করে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে দেন তৎকালীন সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ১৮ মে শেখ হাসিনা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করেন। ঐ মাসেই জীবন দিতে হয় দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বের প্রতীক জিয়াউর রহমানকে। অথচ নির্মম হলেও সত্যি তাঁর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন,“আই এ্যাম নট্ আন হ্যাপি।” অর্থাৎ-আমি অখুশি নই। তবে যে যাই বলুক, জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের উন্নয়ন-শান্তি-সমৃদ্ধি-ঐক্য-অগ্রগতির একটি সাফল্যজনক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। শুধু তাই নয় দল মত নির্বিশেষে সবার জন্য তিনি ছিলেন উদার। দুর্নীতি, লোভ-লালসা, স্বজনপ্রীতি থেকে তিনি দূরে ছিলেন। তাই জীবিত অবস্থায়তো বটেই মৃত্যু পরবর্তীতেও অদ্যবধি শহীদ জিয়ার জনপ্রিয়তার পারদ শুধুই উর্দ্ধমূখী।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিকাশঃ ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সরকারি মালিকানায় মাত্র ৪টি সংবাদপত্র রেখে বাকী সব পত্রিকা নিষিদ্ধ অর্থাৎ বন্ধ করে দিয়ে স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা গ্রস্থ করা হয়েছিলো। সেই থেকে প্রতি বছর সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে ১৬ জুনকে সংবাদপত্রের কালো দিবস পালন করা হয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবাদ পত্রের উপর বিধি নিষেধ তুলে নিয়ে সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্থপতি। জিয়ার দূরদর্শীতার জন্যই আজ বাংলাদেশে এত পত্রিকার ছড়াছড়ি।
জাতীয়তাবাদের রাজনীতিঃ দূরদর্শী সম্পন্ন জিয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালী, সংখ্যালঘু চাকমা, মারমা, সাওতাল সকলকে জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয়তায় এক পরিচয় সূত্রে গেঁথে দেশকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তত্ত্ব হচ্ছে প্রতিটি মানুষের প্রাণের আকাঙ্খা। দেশপ্রেমের প্রেরণার উৎস।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচরণঃ জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশকে নিয়ে সহযোগিতা ফোরাম সার্ক গঠনের স্বপ্ন দ্রষ্টা ছিলেন। এবং ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্বের স্বপ্ন বাস্তবায়নের নেতৃত্বে প্রথম কাতারে অবস্থান করেছিলেন। শুধু তাই নয় ইরাক-ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করে তিনি উভয় দেশকে শান্তিপূর্ণ সহবস্থানে আনতে ভূমিকা রেখেছিলেন। ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তাঁর নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। এখানেও নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্বে জিয়াউর রহমান এগিয়ে।

সর্বোপরি জনপ্রিয়তা, বিচক্ষণতা, সততা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে অকুতভয় দূরদর্শী নেতৃত্ব গুণের জন্য শহীদ জিয়া এক উচ্চ মাত্রায় অনন্যসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব¡ ও শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রধান দাবিদার জিয়াউর রহমান। তবে আওয়ামী বুদ্ধিজীবি, নেতা-কর্মীদের জেনে রাখা জনগণ এখন যে কোন সময়ের চেয়ে আরো বেশী সচেতন। যুক্তি-তর্কের বাস্তবতায় প্রকৃত সত্য তুলে ধরাই যুক্তি-যুক্ত। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার মানসিকতা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। এটা স্বীকার করতেই হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবশ্যই জাতির মহানায়কদের মধ্যে অন্যতম। তাদের উভয়ের কর্মকান্ডের যুক্তি, চুলচেরা বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকেও জাতির মহানায়ক হিসেবে মেনে নেয়াটাও সময়ের দাবী।

গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয় গুলোর বাইরেও আরো কথা থেকে যায়। জিয়ার পদচারণা সর্বব্যাপী বিস্তৃত ছিলো। সেদিকেও কিছুটা আলোকপাত করা যাক। ১৯৮১ সালের ৩০ মে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হলে দেশব্যাপী প্রিয়জন হারানোর হাহাকার ও কান্নার রোল পড়ে যায়। তাঁর জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। বিশ্বের জানাজার ইতিহাসে সর্ব বৃহত্তম জানাজা বলে তা আজও ইতিহাস হয়ে আছে। বিশ্ব ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় তাঁর পরিবার পরিজনদেরকে ক্ষমতার বলয়ে থাকা দূরের কথা ক্ষমতার কাছাকাছিও ঘেষতে দেননি এমনকী তাঁর স্ত্রী আজকের বেগম খালেদা জিয়া এবং জিয়ার ভাইদেরকেও পর্যন্ত প্রভাব খাটানোতো দূরের কথা তাদের প্রচারের আলোয় পর্যন্ত কেউ দেখেনি। শুধু তাই নয় দলীয় নেতা-কর্মীদের দুর্নীতিতে কখনো প্রশ্রয় দেননি। মোটকথা সর্বপ্রকার দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির উর্দ্ধে ছিলেন তিনি। তাঁর আরেকটি বিশেষ গুণ ছিলো তাঁর কর্মকান্ডের সমালোচনা করাকে তিনি সব সময় ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। জনগণকে আপন করে নেয়ার সহজাত গুণ তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলে।

শহীদ জিয়া সামরিক শাসন থেকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসেছিলেন। এখানেও পার্থক্যটা পরিস্কার। শেষ ভালো যার সব ভালো তাঁর এই কথাটির মর্মার্থ এখানে খাটে। জনগণের কল্যাণে, সমাজ-দেশের উন্নয়নে যদি আপনি নিজের কর্মকান্ডকে নিয়ে ব্যাপৃত থাকতে পারেন স্বাভাবিকভাবেই আপনি জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হবেন। ছোটখাট কিছু ঘটনা-দূর্ঘটনা ব্যাতীরেকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যবধি অর্ধ শতাব্দির বেশীকাল থেকে বেশ দাপটের সাথেই রাজনীতির শীর্ষে অবস্থান করছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বার কয়েক রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়েছে এই দল। এই দলের রয়েছে ঈর্ষণীয় পর্যায়ের দল অন্ত:প্রাণ বিশাল কর্মী বাহিনী। আর এদিকে প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন যুগ না হতেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি রাজনীতির অঙ্গনে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গেছে। রাজনীতির লক্ষ্য পূরণে চালকের আসনে এই দলটি অবস্থান করছে। এমনকী জন্ম লগ্ন থেকেই জিয়ার প্রতিষ্ঠিত এ দলটি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়েছে। শুধু তাই নয় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সবচেয়ে বেশী বার ও বেশী সময়কাল দেশ পরিচালনা করেছে এই দলটি। দলের বয়সের প্রায় অর্ধকাল সময় এই দল রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিষ্টিত ছিলো। যা শতাব্দিকাল পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী দলগুলোর পক্ষে আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। যদিওবা প্রতিদ্বন্দ্বি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা ক্যান্টনম্যান্টে এই দলের জন্ম বলে স্বৈরাচারী-সামরিক উর্দি পরা দল বলে অপবাদে বিদ্ধ করতে চায় কিন্তু ইতিহাসের ঘটনা পরিক্রমায় সত্যি এই যে, সামরিক পোষাকের ভেতর থেকে জন্ম নেয়া এই দলটিই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। দেশ-জনগণের বিভিন্ন ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরণে এই দলের নেতৃত্বই সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছেন। “জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো” বহুল প্রচলিত এই প্রবাদকে শতভাগ সত্যে পরিণত করতেই যেন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপির জন্ম। আর ইতিহাস স্বাক্ষি আছে যে দল গণতন্ত্রের তক্মা লাগিয়ে গলাবাজী করে, গণতন্ত্রের জন্য দিবা-নিশী হা-পিত্যেস করে, গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করে সেই আওয়ামী লীগই গণতন্ত্রকে বারবার গলাটিপে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয় একদলীয় বাকশাল গঠন করে কালো আইন করার মাধ্যমে নিজেদের হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগকে তারা নিজেরাই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। এর চেয়ে অগণতান্ত্রিক-স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত আর কী হতে পারে?

আরেকটি কথা এখানে না বললে এ লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তা হলো, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে থাকাবস্থায় জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে মেজর জিয়া সেনাবাহিনীর নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে কষ্ট হবে না, যদি দেশ স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হতো তাহলে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার জন্য মেজর জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতো। যাতে নিশ্চিত ফাঁসির কাষ্টে ঝোলা ছাড়া তাঁর গত্যান্তর ছিলোনা। অসম্ভব দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিলো বলেই মেজর জিয়া সেদিন জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার মতো অসম্ভব সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার অত্মত্যাগ ও জীবনবাজী রাখা সংগ্রামের ফলে দেশ স্বাধীন হলে আন্দোলনের জন্য মিথ্যা মামলায় পশ্চিম পাকিস্তানী জান্তাদের হাতে গ্রেফতারকৃত স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিমা সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখানে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, যদি মুক্তিকামী যোদ্ধারা স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হতেন তাহলে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থা কী হতো সহজেই তা অনুমেয়। হয়তো তাঁকেও রাষ্ট্রদ্রোহীতার জন্য ফাঁসি কাষ্টে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও জিয়াসহ বীর সন্তানদের অকুতোভয় সংগ্রামের ফলেই সব আশঙ্খা দূরিভূত করে সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির স্বাদ নিতে পেরেছিলেন।

পরিশেষে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনার পর শুধু এইটুকু বলতে চাই, দুই জন বিশাল মাপের নেতার মধ্যে আদর্শগত মত পার্থক্যের ভিন্নতা থাকলেও তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল এক। তিনি দেশের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন যার দরুণ দেশ ও জনগণকে ভালোবাসতে গিয়ে তিনি ঘাতকের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের মঙ্গল, জনগণের সুখ-শান্তি আনয়নে শহীদ জিয়া আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। মানুষ মাত্রেই ভুল করে, অনেক ভালো কাজের মধ্যে তাঁরও হয়তো কিছু ভুল ছিলো। তার পরেও জিয়ার মতো সৎ, আদর্শবান, জনগণের জন্য নিবেদিত প্রাণ নেতা হয়ত আমরা আর পাবো না। তিনি মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন। তাঁর দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি মমতা বা ভালোবাসা প্রশ্নাতীত। তিনি দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রেরণার উৎস। আমরা যে যে ভাবধারায় বা মতাদর্শে বিশ্বাসী হইনা কেন শহীদ জিয়ার অবদানকে স্বীকার করে নিয়ে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু প্রদান করা আমাদের সকলের কর্তব্য। এবং দেশের কল্যাণে, জনগণের শান্তির লক্ষ্যে আমাদের সকলকে তাঁর মতো নিবেদিত প্রাণ হওয়া আবশ্যক। জন্মবার্ষিকীর এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আসুন হিংসা, বিদ্বেষকে পেছনে রেখে সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশটাকে আমরা গড়ে তুলি। এই দেশ আমার-আপনার-আমাদের সকলের।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

কোন মন্তব্য নেই