মনজুর আলমের ডিগবাজি….!

0
.
.

আবারও আপন ভুবন আওয়ামীলীগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আওয়ামীলীগে ফেরার মনোবাসনা প্রকাশ করেছেন বিএনপি সমর্থনপুষ্ট সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। অতীতে আওয়ামীলীগের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও বিএনপির টিকেটে তিনি মেয়র নির্বাচন করে মেয়র বনে গিয়েছিনে। গায়ে মাখিয়েছিলেন বিএনপির তকমা। কিন্তু সেই মনজুর আলম দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়ে আবারও আওয়ামী রাজনীতিতে ফেরার আভাস দিচ্ছেন। তারই প্রমান মিলেছিলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন উৎসবে। এরপর ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কথেখাপকথনে আওয়ামীলীগে যোগদানেরই ইঙ্গিত মিলছে।

রাজনীতিতে সাবেক এ মেয়রের ডিগবাজির ঘটনায় ভালো চোখে দেখছেন না তার শুভাকাঙ্খী এবং উভয় দলের নেতাকর্মীরা।

ফাইল ছবি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম মনজুর আলম। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলে আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের সারিতে। শেখ হাসিনা ভালো থাকলে ভালো থাকবে বাংলাদেশ।’

ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নগরীর উত্তর কাট্টলী মোস্তফা হাকিম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ চত্বরে সভা মিলাদ মাহফিল, দোয়া-মোনাজাত আয়োজন ও অসহায় দুস্থদের মধ্যে মিষ্টি ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মনজুর আলম বলেছিলেন, ‘আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাহসী নেত্রী ও দেশ দরদি শেখ হাসিনার ৭২তম জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এ দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

.

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের গুলিতে তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। বেঁচে ছিলেন তিনি ও তার বোন শেখ রেহানা।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্থতা কামনায় মনজুর আলমের পক্ষ থেকে মোস্তফা হাকিম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসংলগ্ন মসজিদে জুমার নামাজের পর দোয়া ও মোনাজাত এবং দুই হাজার মানুষকে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। পরে এক হাজার দুস্থ-অসহায়দের মধ্যে নগদ অর্থ ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

তাই রাজনীতি বোদ্ধাদের অভিমত, রাজনীতিকে যতই বিদায় জানাতে চান রাজনীতি বিদায় জানায়নি মোহাম্মদ মনজুর আলম। চট্টগ্রামের সাবেক এই মেয়র গত তিনবছর বেশি সময় ধরে ব্যবসা আর সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখলেও রাজনীতি তার পিছু ধাওয়া করেছে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন মনজুর আলম। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা মার্কায় নগরীর চারটি আসনের কোনো একটিতে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে লড়বেন-এমন গুঞ্জন নগরীর ভোটারদের মুখে।

.

মনজুর আলম বলেন, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা সবসময় পেয়েছি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমারই ভাতিজা দিদারুল আলমকে তিনি সীতাকু- আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়ে এমপি করেছেন। তিনি আমাকে কোনো নির্দেশ দিলে তা অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মনজুর বলেন, আমি তো সবসময় আওয়ামী লীগের ছিলাম, আমার পরিবারটি আওয়ামী পরিবার। বিএনপির টিকিটে মেয়র হলেও মেয়র থাকাকালে জাতীয় শোক দিবস পালন করেছি, তা তো সবাই জানে।

আওয়ামী লীগে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো কারও সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি। আমি একজন সমাজসেবক। সমাজসেবার কাজেই আছি।

.

জানা যায়, মোহাম্মদ মনজুর আলম ১৯৯৪ সালে নগরীর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে প্রথম ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে আরও দুবার একই পদে জয়ী হন। এই পুরো সময় চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মহিউদ্দিন চৌধুরী আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও মনজুর আলমের পদ ছিল না। তবে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থনেই ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে তিনি ছিলেন মেয়র মহিউদ্দিনের খুবই আস্থাভাজন।

এ কারণে তিনবারের মেয়র মহিউদ্দিন ৯ বার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মনজুর আলমকে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দশমবারের মতো ভারপ্রাপ্ত মেয়র হয়ে একটানা ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেন। আর এই পুরো সময় জেলখানায় ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। মূলত এই দেড় বছরের ঘটনা পরম্পরাই দুজনের গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে বড় ধরনের চিড় ধরায়। মহিউদ্দিন চৌধুরী অবিশ্বাস করেন মনজুর আলমকে। ফলে জেল থেকে বের হয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী পুনরায় মেয়রের দায়িত্ব নিলেও সেই মেয়াদে কমিশনার হিসেবে আর একদিনের জন্যও নগরভবনে যাননি মনজুর আলম।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। আর বিএনপির সমর্থন নিয়ে প্রার্থী হন মনজুর আলম। ওই বছরের ১৭ জুনের নির্বাচনে গুরু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন শিষ্য মনজুর আলম। পুরস্কার হিসেবে বিএনপিতে একটি বড় পদও পান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। তবে বিএনপির সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েই যায়।

.

এমনকি নিজ অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে একটি স্কুলও যথানিয়মে চালাতে থাকেন। এ নিয়ে বিএনপির নেতারা প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও নিজের মত বদলাননি মনজুর আলম। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি আবারও বিএনপির সমর্থনে মেয়র প্রার্থী হন। হেরে যান আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনের কাছে। নির্বাচনের দিনই দুপুরে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন মনজুর আলম।

কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। পরবর্তীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরও একটি অনুষ্ঠানে মনজুর আলম হাজির হন। ওই অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পতাকা এবং মনজুর আলম আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর দীর্ঘদিন রাজনীতি নিয়ে বরাবরই চুপচাপ ছিলেন মনজুর আলম।

মোহাম্মদ মনজুর আলম পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোস্তফা-হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ৩০টিরও বেশি সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়।

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নির্বাচন আসতে হাতে এখনো সময় আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তাকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে তিনি সংসদ নির্বাচনে নৌকার হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কিনা তা ভেবে দেখবেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY