চট্টগ্রামে ৭ লাখ নতুন ভোটার কষছেন নয়াকৌশল

0
.

ভোটের মাঠে নতুন হিসাব কষতে শুরু করছেন চট্টগ্রামের নতুন ৭ লাখ ভোটার। কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান এসব নতুন ভোটার। তবে নতুন ভোটারদের অভিমতও এটাই, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। ভোটের লড়াই হোক হাড্ডাহাড্ডি। চায়ের কাপে উঠুক ঝড়। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত গণতন্ত্রের জন্য শোভনীয় হবেনা বলেও মন্তব্য রেছেন নতুন ভোটারদের অনেকে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসন মহানগরীর ছয়টি থানা ও ১৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত।

তরুণ ভোটারদের অভিমত, ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দাবার গুটি তারা এবার হবেন না। কারন তারা বুঝে গেছেন রাজনীতির চালচিত্র, অভিমতও এটা তাদেরই। তাদের অনেকেরই এটি অভিমত, ক্ষমতাসীন বা বিরোধীদলে যোগ দিয়ে রাজনীতির খাতায় যোগ হচ্ছেন। ব্যবসার জন্য তবে ডাল হিসেবে ব্যবহার করছেন রাজনীতি। এমপি হওয়ার পর পাল্টে গেছে কারও কারও পেশাও। ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি। আগে ব্যবসা না করলেও এমপি হয়ে এখন শিল্পপতি। নামে বেনামে রয়েছে তাদের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

সাফায়েত হাসান নামে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, আমরা যখন দেখি আমাদের জনপ্রতিনিধিরা জনগনের ধারে কাছে না গিয়ে নিজেদের ব্যবসা বানিজ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, তখন ভোটার হিসেবে নিজেদের ছোট মনে হয়। নির্বাচন এলেই এরা মানবদরদী ও জনদরদী হলেও সারা বছরে তাদের ছায়াও জনগন দেখে না।

সাফায়েত আরো জানান, অনেক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নানাভাবে তদবিরে মনোনয়ন লাভ ও নির্বাচনে কালো টাকা ছড়িয়ে দলীয় ভাবমুর্তিকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে যাওয়ার পর আবার ফিরে যান যান পুরোদস্তর ব্যবসায়ী হিসেবে। তারই প্রমান পাওয়া যায় চট্টগ্রামের ব্যানার, পোষ্টার ও মেজবানের রাজনীতি দেখে।

সাফায়াতের মতো নতুন ভোটার রাফহানেরও অভিমত প্রকাশ ধরণ ছিলো একই। রায়হান জানান, পোস্টার, ব্যানারে ছেয়ে গেছে শহর। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার ব্যানার হেড শ্লোগান, বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে নিজের ছবি লাগিয়ে ব্যানার, ফ্যাস্টুন ও পোষ্টারে রঙ্গিন করে যেন নির্বাচনি আমেজ ফিরিয়ে এনেছিল মৌসুমী নেতারা। নিজেকে জানান দিতে, পরিচিতি করতেও বঙ্গবন্ধুর নাম ও ছবি ব্যবহার করছে। মা বাবা, দাদা-দাদীর মেজবানের নামে চলছে রাজনীতির মহড়া। কিন্তু এসবে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করা যাবে না বলেও জানান তিনি।

মো: নাইম নেওয়াজ নামে এক শিক্ষার্থী জানান, আমরা চাই বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। দশম সংসদ নির্বাচনের মতো নির্বাচন এবার আমরা চাইনা। বিএনপিকে নির্বাচনের আসার মাঠ বর্তমান সরকারকেই করতে হবে। সব দল অংশগ্রহণ করলে ভোটের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এদেশের গণতন্ত্র জানান নাইম নেওয়াজ।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান জানান, চট্টগ্রামে এবার ভোটারের মোট সংখ্যা ৫৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬৩। বেড়েছে ৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৬ জন। ফলে নতুন ৫৮টি ভোটকেন্দ্র ও ৮১৬টি বুথ বাড়াতে হয়েছে। এর মধ্যে নতুন ভোটার ৭ লাখ।
মুনীর হোসাইন খান আরো জানান, যে সাত লাখ ভোটার বেড়েছে তাদের মধ্যে ২-১ শতাংশ বাদে পুরোটাই নতুন ভোটার।

তবে একাদশ নির্বাচনে ভোচারদের চিত্র এটি হলেও দশম সংসদ নির্বাচনে চিত্র ছিলো ভিন্ন। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের চট্টগ্রাম জেলায় ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৯ লাখ ২২ হাজার ৪৭৭ জন। তারমধ্যে পুরুষ ভোটার ২৫ লাখ ১৪ হাজার ৫৭৫ ও মহিলা ভোটার ২৪ লাখ ৭ হাজার ৯০২ জন।
এবার ৫৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬৩ জনের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৪২১ ও মহিলা ভোটার ২৭ লাখ ২৪ হাজার ৯৪২।

থানাভিত্তিক পৃথক বিশ্লেষনে দেখা গেছে, নগরীর পাঁচলাইশ থানায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৯, চান্দগাঁওয়ে ৩ লাখ ১ হাজার ৬৯১, কোতোয়ালীতে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯১৪, ডবলমুরিংয়ে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০, পাহাড়তলীতে ২ লাখ ৫২ হাজার ৯০৪ ও বন্দর থানায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৬৭ জন ভোটার আছেন।

চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে মীরসরাইয়ে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৩, সন্দ্বীপে ২ লাখ ৩ হাজার ২৮৫, সীতাকুন্ডে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬১৪, হাটহাজারীতে ৩ লাখ ৭ হাজার ৯৪০, রাউজানে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮২, রাঙ্গুনিয়ায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ১২২, বোয়ালখালীতে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৪৭, পটিয়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭৭, কর্ণফুলীতে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৫৭, আনোয়ারায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪২, চন্দনাইশে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫, সাতকানিয়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৭, লোহাগাড়ায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৩২০ ও বাঁশখালীতে ৩ লাখ ৩ হাজার ৯ জন ভোটার আছেন।  সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে ভোটকেন্দ্র বেড়েছে ৫৮টি। দশম সংসদ নির্বাচনের চট্টগ্রাম জেলায় ভোটকেন্দ্র ছিল ১৮৪০টি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে মোট ভোট কেন্দ্র থাকবে ১৮৯৮টি।

পাশাপাশি বেড়েছে বুথের (ভোটকক্ষ) সংখ্যাও। দশম সংসদ নির্বাচনের চট্টগ্রাম জেলার কেন্দ্রগুলোতে বুথ ছিল ৯ হাজার ৮৬৭টি। নতুন যুক্ত হওয়া ৮১৬টি বুথ মিলিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বুথ থাকবে ১০ হাজার ৬৮৩টি।

এদিকে চট্টগ্রাম কর্পোরেশন এলাকায় ভোটকেন্দ্র বেড়েছে ১১টি আর ভোটকক্ষ বেড়েছে ১৭২টি।এর মধ্যে নগরীর পাঁচলাইশে একটি কক্ষ বেড়ে ১০১টি ভোটকেন্দ্র করা হয়েছে। ভোটকক্ষ আগের চেয়ে ২০টি কমে হয়েছে ৫৬৭টি।

চান্দগাঁও থানায় পূর্বের একশটি ভোটকেন্দ্র অপরিবর্তিত আছে। ভোটকক্ষ ৬৩টি বেড়ে হয়েছে ৫৯৮টি।কোতোয়ালীতে একটি কেন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯টি। ভোটকক্ষ ৩৩টি বেড়ে হয়েছে ৪৪৯টি। ডবলমুরিং এ ১০৩টি ভোটকেন্দ্র অপরিবর্তিত রয়েছে। ভোটকক্ষ ১৬টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৩টি। পাহাড়তলীতে আটটি ভোটকেন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১টি। ভোটকক্ষ ৬৮টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮৬টি। বন্দর থানায় একটি কেন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০১টিতে। ১২টি ভোটকক্ষ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৬টিতে। এদিকে চট্টগ্রাম জেলায় ভোটকেন্দ্র বেড়েছে ৪৭টি আর ভোটকক্ষ বেড়েছে ৬৪৪টি।

চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় ৭টি ভোটকেন্দ্র বেড়ে আগামী নির্বাচনের জন্য ১০৩টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্তদ করা হয়েছে। ভোটকক্ষ ৮০টি বেড়ে করা হয়েছে ৬৫০টি। ফটিকছড়ি উপজেলায় তিনটি ভোটকে›ন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬টি। ৯৩টি ভোটকক্ষ বেড়েছে দাঁড়িয়েছে ৬৯০টি। সন্দ্বীপ উপজেলায় ৭৯টি ভোটকেন্দ্রের পরিবর্তন হয়নি। ৫টি কক্ষ বেড়ে হয়েছে ৩৬৫টি। সীতাকুন্ড উপজেলায় ৮২টি ভোটকেন্দ্র ও ৫০৪টি ভোটকক্ষ অপরিবর্তিত রয়েছে। হাটহাজারী উপজেলা ১০৬টি ভোটকেন্দ্র বহাল রয়েছে। ৫৮টি ভোটকক্ষ বেড়ে হয়েছে ৫৫৯টি। রাউজানে একটি কেন্দ্রে বেড়ে হয়েছে ৮৪টি। ভোটকক্ষ ৪৫৫টি অপরিবর্তিত রয়েছে।ন রাঙ্গুনিয়ায় তিনটি ভোটকেন্দ্র বেড়ে ৮৮ টিতে দাঁড়িয়েছে। ভোটকক্ষ ২১টি বেড়ে হয়েছে ৪৪৩টি। বোয়ালখালীতে ৭৭টি ভোটকেন্দ্র বহাল রয়েছে। ভোটকক্ষ ৫৩টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১১টি। পটিয়ায় ১২টি ভোটকেন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১টি। ভোটকক্ষ ১৫০টি বেড়ে হয়েছে ৬৭৯টি। কর্ণফুলী উপজেলায় ভোটকেন্দ্র ৩২টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টি। আর ভোটকক্ষ ৬৬টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৫টি।

আনোয়ারায় একটি ভোটকেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ৬৭টি। ১৫টি ভোটকক্ষ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০১টি। চন্দনাইশ উপজেলায় একটি কেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ৬৮টি। ভোটকক্ষ ৩৫৫টি অপরিবর্তিত রয়েছে। সাতকানিয়ায় ১৩টি ভোটকেন্দ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪টি। ভোটকক্ষ ২৮টি বেড়ে হয়েছে ৫৭০টি। লোহাগাড়ায় একটি কেন্দ্রে কমে হয়েছে ৫৯টি। ৪০টি কক্ষ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৭টি। বাঁশখালীতে ১১০টি ভোটকেন্দ্র অপরিবর্তিত রয়েছে। ৩৫টি ভোটকক্ষ বেড়ে হয়েছে ৫৯০টি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শেখ জহির আহমেদ নতুন ভোটার প্রসঙ্গে জানান, নতুন ভোটাররা নতুন প্রজন্মের ফসল। আগের প্রহন্মের সাথে তাদের চিন্তাধারার পার্থক্য থাকবে। আগে শুধুমাত্র নিজের বুদ্ধি থেকে ভোটের ব্যালট পেপারে সিল মারা হতো। কিন্তু এখন বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম বিভিন্নজনের চিন্তাধারা, মতামতকে প্রকাশ করছে। সেসব দেখে নতুন ভোটাররা নিজের মতামতের সাথে তা নতুন করে মিলাচ্ছে। এখন রাজনীতিবিদদের নতুন ভোটারদের দিয়ে অসৎ স্বার্থসিদ্ধি অতোটা সহজ না বলে জানান এই অধ্যাপক।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন