রুই-কাতাল, বোয়াল-চিতলে ভরপুর কাপ্তাই হ্রদে সোনালী স্বপ্নের হাতছানি

0
.

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি
দেশের মিঠা পানির মাছের অন্যতম উৎস কাপ্তাই হ্রদের একটি চিতল মাছ বিক্রি হয়েছে ৩২ হাজার টাকায়। তেমনিভাবে একটি কাতল মাছ (৩০ কেজি)বিক্রি হয়েছে ৫০ হাজার টাকায়। এভাবেই একের পর এক বিশাল আকৃতির মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ায় মৎস্যজীবিদের মাঝে হ্রদ ঘিরে যেমন নতুন স্বপ্ন তৈরি হচ্ছে তেমনি প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে। পরিবেশগত ও ভৌগলিক প্রকৃতি নির্ভর পাহাড় আর জলসম্পদে ভরপুর পার্বত্য রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে আশাতিত ভাবে বেড়েছে দেশীয় প্রজাতির বড় মাছের উৎপাদন।

সারাদেশের মধ্যে অন্যতম অপূর্ব মনোরম পরিবেশে মৎস্য সম্পদের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থান আলোকিত করে রেখেছে কাপ্তাই হ্রদ। প্রায় প্রতিদিনই হ্রদে ধরা পড়ছে বড় বড় রুই-কাতলা, চিতল থেকে শুরু হরে হরেক রকম কার্প জাতীয় দেশীয় প্রজাতির মাছ। অথচ মাত্র এক দশক আগেও কাপ্তাই হ্রদ নিয়ে ব্যাপক দুঃচিন্তায় ছিলো সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষসহ হ্রদের উপর জীবিকা নির্ভর লাখো মানুষ। দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার ফলশ্রুতিতে কাপ্তাই লেকের মৎস্যসম্পদ ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাঙামাটি বিএফডিসি’ কর্তৃপক্ষের যৎসামান্য উদ্যোগে আবারো মৎস্য সম্পদে ভরপুর হয়ে আমিষের অন্যতম ভান্ডারে পরিণত হতে চলেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। আশায় বুক বেধেছে হ্রদের মৎস্য ব্যবসার সাথে জড়িত জেলে ও ব্যবসায়িরা।

.

শহরের বনরূপা বাজারের অন্যতম শীর্ষ মৎস্য ব্যবসায়ি সেন্টু সরকার জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদ থেকে জেলেদের মাধ্যমে আহরিত বড় বড় মাছগুলোর প্রায় অধিকাংশই আমি কিনে বাজারের দোকানে খুচরা বিক্রয় করি। রবিবার আমি রাঙামাটি শহরের উপকন্ঠে রাজবাড়ী এলাকার কাপ্তাই হ্রদ থেকে স্থানীয় এক জেলে কর্তৃক আহরিত ১৬ কেজি ওজনের চিতল মাছ কিনেছি। সেটি আমি বিক্রয় করেছি ৩২ হাজার টাকায়।

এছাড়াও এরআগে আমি ৩০ কেজি ওজনের কাতল মাছ বিক্রি করেছি ৪৮ হাজার টাকায়। সোমবার আমি ২০ ও ১৮ কেজি ওজনের দুটি কাতলা মাছ বিক্রি করেছি ৩৮ হাজার টাকায়। তারও আগে আমি ১৮ কেজি ওজনের একটি বোয়াল মাছ বিক্রি করেছি ৩৬ হাজার টাকায়।

বনরূপাস্থ মাছ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে মাছের ব্যবসারত সেন্টু জানান, বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে যে হারে বড় বড় মাছ ধরা পড়ছে, বিগত এক দশকে আমরা এবারের মতো ধারাবাহিকভাবে বড় বড় মাছ ধরা পড়তে দেখিনি। বিগত বছর থেকে এবছর বিপুল পরিমানে বড় মাছের উৎপাদন ব্যাপকহারে বেড়েছে কাপ্তাই হ্রদে। তিনি জানান, আমার মতো এখানকার ব্যবসায়িদের বিশাল একটি অংশ বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের মাছ বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছে। অথচ মাত্র দুই বছর আগেও আমরা শহর থেকে বার্মিজ রুই, আর সাগরের মাছ এনে বিক্রি করতাম।

এদিকে স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়িরা জানিয়েছেন, সম্পূর্ন প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা কাপ্তাই হ্রদের মাছের স্বাদ অন্য অঞ্চলের মাছ থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন এবং সুস্বাধু হওয়ায় স্থানীয়দের পাশাপাশি রাঙামাটির চাকুরীজিবী ও এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের মাঝে কাপ্তাই হ্রদের মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকায় দাম একটু বেশি নিলেও স্বাদ গ্রহণে আপত্তি করেনা কেউই।

চট্টগ্রাম থেকে সরকারী কাজে রাঙামাটিতে আসা শরিফুল আলম নামে একজন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শহর ত্যাগের সময় পরিবারের জন্যে ১০ কেজি ওজনের একটি কাতল ও ৬ কেজি ওজনের একটি রুই কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিবেদকের সাথে বনরূপায় মুখোমুখি সাক্ষাতে তিনি জানালেন, ভাই আমি প্রতি মাসে অন্তত দু’বার রাঙামাটিতে আসি। গত বছর প্রথমবার এখানে আসলে স্থানীয় হোটেলে আমি এখানকার রুই মাছ দিয়ে খাবার খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেয়েছিলাম। এরপর থেকেই সারাদিনের অফিসিয়ালি কাজ সেরেই আমি যাওয়ার সময় কাপ্তাই হ্রদের মাছ নিয়ে যাই। আমার চট্টগ্রামের ভাড়া বাসায় নিজেরা সামান্য কিছু রেখে বাকিটুকু নাটোরে আমার আব্বা-আম্মার জন্যে পাঠিয়ে দিই। আমার বাবা-মা কাপ্তাই হ্রদের মাছ পেলে যারপরনাই খুশি হয়। সন্তান হিসেবে এটা আমার জন্যে অন্য রকম অনুভূতি।

.

এদিকে রাঙামাটির বাজার গুলোতে বড় বড় ও কোন কোন প্রজাতির কি পরিমাণ মাছ বিক্রি করার জন্য উঠছে এই তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে সরেজমিনে পরিদর্শনে যাচ্ছেন রাঙামাটিস্থ বিএফডিসির ব্যবস্থাপক নৌ-বাহিনীর কমান্ডার মোঃ আসাদুজ্জামান। মাছের উৎপাদন ও বিপনন নিয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিগত বছরগুলোর ন্যায় আমরা গত বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে অবৈধ জাঁক অপসারণ, হ্রদের কচুরিপানা বিনষ্টকরা, মাছের অভয়াশ্রমগুলোকে মোটামুটি যতটুকু সম্ভব নিরাপদ রাখতে পারাসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করে গড়ে তুলতে সক্ষম হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে ৫ কেজি থেকে শুরু করে ৩০/৩২ কেজি ওজনের মাছ বিক্রি হওয়া অন্তত এটাই প্রমান করছে। তিনি জানান, আমাদের বিএফডিসি কতৃক এবছর রাজস্ব আয়ও বিগত বছরের চেয়ে অনেক বেশি হবে। কাপ্তাই হ্রদ নিয়ে উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষ যদি আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কাপ্তাই হ্রদের মাছ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে বলেও মন্তব্য করেছেন নৌ কমান্ডার আসাদুজ্জামান-বিএন।

ঢাকা থেকে রাঙামাটির মৎস্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করা ব্যবসায়িরা ও স্থানীয় সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডাররা জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএফডিসির সংশ্লিষ্ট কিছু কিচু কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার ফলে অন্যতম সম্পদ নির্ভর কাপ্তাই হ্রদ আবার পুরাতন যৌবন ফিরে পেতে শুরু করেছে কিন্তু তা তেমন আহামরি নয় কারণ গত কয়েক বছরে মাছের উৎপাদন এবং হ্রদের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের আয় বৃদ্ধি পেলেও অজ্ঞাত ও অজানা কারণে বাড়ছে না মাছের পোনা অবমুক্তির পরিমাণ।

বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হ্রদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় জনবল ও ইকুইপমেন্ট বৃদ্ধির মাধ্যমে যদি আরো জোরালো কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি, মাছ ধরাকালীন নিষিদ্ধ সময়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা, হ্রদে জেলের সংখ্যা আর বৃদ্ধি না করা, ইঞ্জিনচালিত নৌযান বৃদ্ধিরোধ করাসহ মাছের অভয়াশ্রম ও প্রজনন কেন্দ্রসমূহকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করাসহ, বিএফডিসির নিজস্ব হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেনুর মাধ্যমে নির্দিষ্ট্য আকারের পোনা কাপ্তাই হ্রদে অবমুক্ত করতে পারলে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই হ্রদটিকে আমিষের ভান্ডারে পরিণত করা স্বল্পতম সময়েই সম্ভবপর হবে।

সংশ্লিষ্ট্যদের মতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে অবশ্যই হ্রদে মাছ ধরা বন্ধকালীন তিন মাস সময় কালে কোনোভাবেই মাছ আহরণ করতে দেয়া যাবে না এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের মধ্যে বড় প্রজাতির মাছ কিংবা কার্প জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল) ওপর কর ধার্য করতে হবে। তাদের যুক্তি, যদি বার্গার, স্যান্ডউইচ কিনতে ট্যাক্স প্রদান করতে হয়, তাহলে বড় মাছ খেতে কর প্রদান করা থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় যৌক্তিকতা নেই। এছাড়াও হ্রদে প্রতি বছর ৩-৪ দিন বয়সের যে পোনা অবমুক্ত করা হয় তার একটি বৃহদাংশ নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে মারা যায়। এজন্য নূন্যপক্ষে ৯ ইঞ্চি সাইজের পোনা হ্রদে ছাড়া উচিত এমন মন্তব্য করে সচেতন মহল বলছেন, এই কাপ্তাই হ্রদে উৎপাদিত মাছ দিয়েই পুরোদেশের জনগণের আমিষের চাহিদার অনেকাংশ মেটাতো সম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন এখানকার সচেতন মহল।

উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে এই পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বাপেক্ষা আলোড়ন সৃষ্টিকারী নয়নাভিরাম বৃহৎ এই কাপ্তাই হ্রদের জন্মলাভ ঘটেছিল। দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টিকরা কাপ্তাই হ্রদের আয়তন ৭২৫ বর্গকিলোমিটার এবং হ্রদের নূন্যতম গভীরতা ১০ ফুট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা গড়ে ৪৯৫ ফুট। বিশালাকৃতির এই হ্রদ দেশের মিঠা পানির মাছের একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। বিগত ১৯৬৪ সালের পর থেকে মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসিকে এই বিশাল জলাভূমির সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয় যা অদ্যাবধি বিরাজমান আছে।

দেশীয় মৎস্য প্রজাতির এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধশীল জলভান্ডার রাঙামাটির কাপ্তাই লেক। সরকারী কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসেব মতে, গবেষণার সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক এ লেকে ২ প্রজাতির চিংড়ি, ১ প্রজাতির ডলফিন, ২ প্রজাতির কচ্ছপ ও ৭৮ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ প্রজাতির মাছ হচ্ছে দেশীয়, আর বাকি ১০টি বিদেশি। বর্তমানে ৪২টি প্রজাতির মাছ এ লেক থেকে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত হচ্ছে। এদের মধ্যে কেচকি, চাপিলা, রুই-কাতলা, কালিবাউস, তেলাপিয়া, বাচা, পাবদা, কাজলি, আইড়, মলা, কাটা মইল্যা, বাটা, ফলি, গজার, শোল, বাইন, ছোট চিংড়ি ইত্যাদি অন্যতম।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন