তৈরি হয়েছে ন্যাচারাল মিনি এভিয়ারি’ শিগগির যুক্ত হচ্ছে ক্যাঙ্গারু ও উট পাখি
দর্শনার্থীদের টাকায় বদলে গেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা

0
.

দেশ বিদেশের বিভিন্ন বণ্যপ্রাণী ও পাখিদের সাথে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের একটিই মাত্র মাধ্যম চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। মাত্র চার বছর আগেও চরম অব্যবস্থাপনার ফলে এটি ছিলো জীর্ণশীর্ণ খাচার গোডাউন। তখন নামে চিড়িয়াখানা হলেও এটি মূলত কপোথ কপোথীদের আড্ডাস্থল হিসেবেই ব্যবহার হতো। ফলে পুরো এলাকাটি নোংরা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে থাকত চারপাশ। আর্থিক দৈন্যদশায় পশু পাখি ও জীব জন্তুর অভাবে খুঁড়িয়ে চলা এ বিনোদন স্পটটি রুপান্তরিত হয়েছিলো অনেকটা হাসির খোঁড়াকে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো নগরীর আশেপাশের পর্যটকরাও।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সার্বিক তত্বাবধানে পরিচালিত চট্টগ্রামের একমাত্র চিড়িয়াখানাটিতে দর্শনার্থী টানতে আবারো উদ্দ্যেগী হন জেলা প্রশাসন। ২০১৪ সালের ৬ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের নির্দেশে চিড়িয়াখানা তদারকির মূল দায়িত্ব পায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন। আর্থিক দৈন্যদশায় খুঁড়িয়ে চলা এমন লস প্রজেক্টকে নান্দনিকতার ছোঁয়া দিতে শুরু হয় রুহুল আমিনের কঠিন অধ্যাবসায়। তার কঠোর সাধনা, চিন্তা চেতনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাত্র কয়েক বছরে বদলে যায় চিড়িয়াখানার রুপ। শুধুমাত্র দর্শনার্থীদের টিকেটের টাকায় বদলে যায় চট্টগ্রামের একমাত্র চিড়িয়াখানাটি। পাহাড়বেষ্টিত পরিবেশে আশির দশকে নির্মিত এই বিনোদনকেন্দ্রটি পেয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। ফলে দর্শক শূণ্যতায় প্রকট থাকা বিনোদন স্পটটিতে এখন প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার দর্শনার্থী টিকেট কেটে প্রবেশ করছে। বন্ধের দিনে হয় দ্বিগুন।

.

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে সিংহ, বাঘ-বাঘিনী ও হরিণসহ নানা প্রাণী আনার পাশাপাশি লাল, সবুজ, নীল, বেগুনি, গোলাপিসহ নানা রঙের প্রলেপ ও দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে তৈরি বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে দর্শনার্থীর বিশ্রামের জন্য। বৃদ্ধি করা হয়েছে ঔষধি ও ফলজ গাছের সংখ্যা। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো চিড়িয়াখানাকে আনা হচ্ছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। সর্বশেষ ৩৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৬ প্রজাতির ৩৪২টি পাখির সমাহারে তৈরি করা হয় মিনি এভিয়ারি। ময়ূর, ধনেশপাখি, শকুন, চিল, নানা প্রজাতির বক ও পেঁচাসহ কিছু পাখির জন্য আলাদা আলাদা প্রদর্শনী থাকলেও নবনির্মিত পক্ষীশালাটি শুধুমাত্র পাখিদের জন্যই করা হয়।

চিড়িয়াখানার গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন পক্ষীশালাটি। যেখানে আনা হয়েছে ৬ প্রজাতির ৩৪২টি পাখি। দর্শনার্থীর পদচারনা আর নবনির্মিত বিশাল অবকাঠামোই স্বাধীনভাবে পাখিদের বিচরণ এ যেন এক অন্যরকম পরিবশে। রঙ-বেরঙের এমন সব পাখি নিয়ে নির্মিত পক্ষীশালাটি দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় বুধবার। এদিন সকালে প্রথমে ফিতা কেটে দৃষ্টিনন্দন পক্ষীশালাটির খাঁচায় প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন। পরে পাখিদের সে খাঁচায় অবমুক্ত করে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি।

.

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, নতুন আঙ্গিকে সাজাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে নানা পদক্ষেপ। শুধুমাত্র দর্শনার্থীদের টাকায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে নান্দনিক করে তোলা হচ্ছে। সর্বশেষ সংযোজন পক্ষীশালা নির্মাণ। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ‘অদল-বদল’ প্রক্রিয়ায় রংপুর চিড়িয়াখানায় একটি সিংহী দিয়ে একটি সিংহ আনা হয়।

২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে এক জোড়া বাঘ আনা হয় এ চিড়িয়াখানায়। চলতি বছরের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি জেব্রা সংগ্রহ করা হয়েছে। শিশু কিশোরদের পশু পাখি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সেগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে দর্শকদের টাকায় নানা প্রজাতির পশু পাখি ও জীব জন্তুর সমাহার করা হয়েছে।

.

দর্শানার্থীদের আরও আকর্ষণ করতে শিগগির অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্যাঙ্গারু আর উট পাখি আনার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। তাছাড়া চিড়িয়াখানার জায়গা স্বল্পতা দূর করতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকেও কিছু জায়গা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন।

চিড়িয়াখানা নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব ও হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানিয়েছেন দর্শনার্থীদের বিভিন্ন পাখি দেখার সুযোগ করে দিতে জেলা প্রশাসকের পরিকল্পনা আর নির্দেশনায় ন্যাচারাল মিনি এভিয়ারিটি তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, দৈর্ঘে ৬০ ফুট আর প্রস্থে ২৫ ফুট আয়তনের পক্ষীশালাটি ২০ লাখ টাকা অবকাঠামো ব্যয়, বাকি ১৪ লাখ টাকা ৬ প্রজাতির ৩৪২ টি পাখি ক্রয়ে ব্যয় করা হয়েছে। ক্রয় করা পাখির মধ্যে ২০ জোড়া লাভ বার্ড, ৫০ জোড়া লাফিং ডোব, ১০ জোড়া ফিজন্ট, ১০ জোড়া রিংনেক প্যারট, ৫০ জোড়া ককটিয়েল, ১ জোড়া ম্যাকাও রয়েছে। বাকীগুলো বিভিন্ন প্রজাতির।

.

শুধুমাত্র দর্শনার্থিদের প্রবেশ টিকেটের মূল্য দিয়েই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় নান্দনিকতার ছোঁয়া লাগানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকেটের টাকায় এ চিড়িয়াখানায় নির্মিত হয়েছে আকর্ষনীয় ফটক। প্রধান এ ফটকে ব্যয় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে নির্মিত হয়েছে ৩২ হাজার ১৬৪ বর্গফুট সড়ক। শিশুদের জন্য করা হয়েছে কিডস জোন। দর্শনার্থী বসার জন্য বেঞ্চ তৈরি, শৌচাগার তৈরি। প্রায় এক হাজার ফলদ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে এ চিড়িয়াখানায়। ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে চিড়িয়াখানার চারপাশে সুউচ্চ সীমানা প্রাচীর। দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছে সুপ্রশ্বস্থ সিঁড়ি। জেলা প্রশাসনের সার্বিক নির্দেশনা ও তাদের সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের অবদানে চিড়িয়াখানাটি আজ পূর্ণ্যতা ফিরে পেয়েছে।

জানা যায়, ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান ফয়’স লেকের পাশে ছয় একর জমিতে বিনোদনের জন্য চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হওয়া চিড়িয়াখানাটি এক সময়ে হয়ে ওঠে চট্টগ্রামবাসীর বিনোদনের অন্যতম স্থানে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ চিড়িয়াখানায় বর্তমানে বাঘ, সিংহ, হরিণ, কুমির, অজগর, ভাল্লুক, জেব্রা, উট পাখিসহ প্রায় ৬৭ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন