প্রসঙ্গ মুক্ত গনমাধ্যমঃ এখন নাচুনে বুড়িদের যুগ

0
.

এক.
এক ধরনের তথ্য প্রচারের কাজে নিয়োজিত হলেও রাজ দরবারের ফরমান ঘোষক রাজ কর্মচারীকে সংবাদকর্মী কিংবা সাংবাদিক বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। গনবিরোধী, দুর্নীতিবাজ আর জনগনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজদন্ড দখলে নেয়া শাসকগোষ্ঠির বিস্তৃত আলখেল্লার ছায়াতলে অবস্থানকরে ক্ষমতার আগপাশতলা ভোগরতরা কখনো দেশ এবং জনগনের পক্ষে, জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে, শাসকের ভয়, চাপ আর প্রলোভন উপেক্ষা করে, অন্ধকার বিদীর্ন করে আলোকধারা সন্ধানরত শত শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক সাংবাদিক সমাজের গর্বিত অংশ হতে পারে না।

.

মার্কিনীদের ইরাক আগ্রাসনকালে আগ্রাসীদের বানানো মোড়কে কথিত সমর সংবাদ আর বিজয়ডঙ্কা বাজানোর জন্য নিয়োজিত সংবাদকর্মীগন- যারা কিনা এমবেডেড জার্নালিস্ট হিসাবে স্বনামখ্যাত হয়েছিলেন – তাদের এদেশীয় ভাই-বেরাদরদের ব্যাপক ব্রিডিং দেখলে মুক্ত সাংবাদিকতা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার রেটিং কোন তলানীতে এসে ঠেকেছে তা একটু চোখ-কান খোলা যে কারো বুঝতে কস্ট হবার কথা নয়।
স্বাধীন গনমাধ্যম আর মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি সভ্য, গনতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম মূল ইনডে´। রাস্ট্রের তিন মূল স্তম্ভগুলোসহ অন্যান্য অর্গানগুলো বিরাজমান আর সক্রিয় দাবী করে একটি রাস্ট্রকে যতই গনতান্ত্রিক বলে জাহির করার কোরাস গাওয়া হোক না কেন, এর চতুর্থ স্তম্ভ তথা স্বাধীন গনমাধ্যমের অনুপস্থিতি ঘটলে একে কোনভাবেই গনতান্ত্রিক, সভ্য বলে দাবী করার সুযোগ নেই। জনগনানুগত আর সত্যানুগত নয় , দলকানা-দলানুগত সাংবাদিকতার যে ট্রেন্ড , নৈতিকতা আর নির্মোহ মানদন্ডে উত্তীর্ন তথ্যাবলী আর জনস্বার্থকে দক্ষতার সাথে সাধারণ্যে পৌছে দেয়ার পবিত্র দায়িত্ব ভুলে রাজ ফরমান পৌছে দেয়ার , শাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রতিধ্বনিত করার গুরু দায়িত্ব যারা স্বত: ষ্ফুর্তভাবে স্বস্কন্ধে তুলে নিয়েছেন তারা মুক্ত সাংবাদিকতার গনশত্রু ছাড়া আর কিছুই নন। হুজুগ, আতংক ছড়ানো, কাউকে ঘায়েল করার জন্য শাসকশ্রেনীর নীলনকশার অংশ হয়ে রাজদন্ড স্টাবলীশ করার হাতিয়ার বানানো হয়েছে সাংবাদিকতার মহৎ অস্ত্রটিকে।

এখানে সত্য-মিথ্যা ঠাওর করা দু:সাধ্য। জনগন প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য ছাতক পাখির মত হা-পিত্যেশ করছে। কখনো মোবাইল সংলাপ, কখনো নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঁিক দিয়ে পরখ করতে চায় আসলে কী ঘটেছিল। পক্ষপাতদুস্টু আর পক্ষাঘাতগ্রস্তদের উদ্বাহু নৃত্যের মূখে গনমাধ্যমের গ্রহনযোগ্যতা আর বিশ^াস যোগ্যতা সত্যি সত্যি হুমকীগ্রস্থ। আমজনতা এখন মনে করতে শুরু করেছে “ তাহারা যাহা বলেন তার উল্টোটাই সম্ভবত সত্য”।

এদেশের প্রতিটি গনতান্ত্রিক আর স্বাধীকার আন্দোলনে অকুতোভয় সাহসী ভূমিকা পালন করার ঐতিহ্যে ভাস্বর সাংবাদিক সমাজের দায়িত্বশীল আর সত্যানুসন্ধানী অংশটি আজ চরম হতাশা, ক্ষোভ আর অপমানে নিজেকে মূক আর বধিরের ভূমিকায় নামাতে বাধ্য করেছে।

দুই:
চরম নিবর্তনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন শাসকশ্রেনীর সবচেয়ে যুৎসই অস্ত্র। দেশে মতপ্রকাশ ও সংবাদ–মাধ্যমের স্বাধীনতা এখন ভীষনরকম হুমকির মুখে। ভয় এখন আর চাপা নেই। খাপখোলা তলোয়ারের মত এটি এখন সর্বদা নিরীহ সংবাদকর্মীর/ জনগনের ঘাড় বরাবর অবস্থান নিতে সদা প্রস্তুত। অন্ধকারের ব্যাপক গ্রাসের মুখেও যারা সত্য প্রকাশে উদগ্রীব তারা সেল্ফ সেন্সরশীপে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি রয়েছে দৃশ্য-অদৃশ্য নানা মহল ও গোষ্ঠীবিশেষের চাপ, হামলা এবং হুমকিও। কার্যতঃ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে এবং ভয়ের সংস্কৃতি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গেছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গণমাধ্যমসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে গত বছর পাস হওয়া গণধিকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আরও যে বিষয়গুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে, তার মধ্যে আছে: সবল বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া; গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা; এবং সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে গোয়েন্দা নজরদারি। আছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল আর অর্থ-প্রতিপত্তিতে ক্ষমতাশালী দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীর হুমকি-ধমকি থেকে শুরু করে দমন-পীড়ন-নির্যাতন এমনকি হত্যার ঝুঁকি। অসহিষ্ণুতা ও ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ সামাজিক পরিসরে বড় সমস্যা।

বাকশাল রাজত্বে চারটি ব্যতিত সকল সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। চলছে সতীনের সংসার খালি করে নিজ গোত্রের পাল্লা ভারী করার নীতি। দুর্নীতি-কুশাসনের কুফল বর্ণিত হলে পরে তাকে বিরোধী বলে আখ্যায়িত করে গলা চেপে মেরে ফেলা হয়েছে। শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে নানা অপব্যবসার ফন্দি এঁেট জনগনের টাকা লুটকারী কর্পোরেট হাউজের ব্যনারে এখন যত্তসব মিডিয়ার বাহারি প্রসার । একই ফ্যাক্টরী থেকে নানা মোড়কে পরিবেশিত তথ্যকে জনগনকে গেলানোর কত কত চেস্টা যে চলছে এসব মিডিয়া দিয়ে তার ইয়ত্বা নেই। সুসংবাদকর্মীরা এখন শাসককূলকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্বটি স্বত:স্ফুর্তভাবে স্বস্কন্ধে তুলে নিয়েছেন। জুজু আগমনের ভয়ে তারা নিজেরাই এখন নিজেদের পেশাগত, অবৈধ আয়-রোজগারের কাজাঞ্চিখানাটি অনিরাপদ বলে মনে করছেন ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবাদ ও উদ্বেগকে থোড়াই আমলে নেয়া হয়েছে। চরম নিবর্তনমূলক আইনটির ভয়াবহ ধারালো দন্ত-নখরগুলো ছেটেছুটে একে কিছুটা ভদ্রস্থ রুপ দেয়ার নাগরিক আবেদনেও সাঁড়া দেয়া হয়নি। শুধু উপরের লেবেলে নয়, মফস্বল শহরের সুবিধাবঞ্চত সংবাদকর্মীরাও হরহামিশা জেল –জুলুম হামলা-মামলার শিকার হয়ে এ আইনের ফজিলত বুঝতে শুরু করেছে। মিডিয়ার আন্তজাতিক সংস্থাসমূহ -প্যারিসভিত্তিক রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ), নিউইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) এর আবেদন-নিবেদন সুপারিশকে পাত্তাও দেয়া হয়নি। কিন্তু সুশীল সমাজের কাছে ভীষন আবেদনময়ী আইনসভায় এ ধরনের একটি নিবর্তনমূলক আইন পাশ করতে কোন বেগ পেতে হয়নি । এই আইনের নিবর্তনমূলক সব ধারা বাতিলের দাবি করে দেশে সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষায় সংগ্রামরত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজেসহ অন্যান্য সংগঠনসমূহ সোচ্চার হলেও তাদের দাবী-প্রতিবাদ আমলে নেয়া হয়নি।

বিশ্বে সাংবাদিকতায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে পাঁচ বছর আগেই অন্তর্ভুক্ত করেছে সিপিজে। বাংলাদেশ এ তালিকায় উঠেছে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন, গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ এবং বন্ধ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বার্ডারস এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম। এর আগের বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছির ১৪৬তম। কেবল সূচকে চার ধাপ অবনতিই নয়, নেতিবাচক সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ।

স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ফেসবুক এখন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। গত আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের সময় দেশে-বিদেশে সুপরিচিত আলোকচিত্রী ড. শহীদুল আলম গ্রেপ্তার হন আল-জাজিরায় তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে (আইসিটি) মামলা হয়। পুলিশ হেফাজতে এ ধরনের একজন শিক্ষিত, ভদ্র বয়োবৃদ্ধ নাগরিককে ঘুষি মেরে নাক ফেটে রক্তাক্ত করার অভিযোগ পুলিশ উড়িয়ে দিলেও কেউ বিশ^াস করেনি। এরপর ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা কমে গেছে।

টেলিফোনেও মানুষ এখন মন খুলে কথা বলতে ভয় পান। বিভিন্ন সময়ে অনেক বিরোধী রাজনীতিকের টেলিফোন আলাপ ফাঁস হয়েছে। অনেককে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ফোন আলাপের কারণে জেল খেটেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অনেকে। হাস্যকর অভিযোগ আর মামলায় জেল যেতে হয়েছে ব্য্যরিষ্টার মঈনুল হোসেনের মত ব্যক্তিত্বকেও। কিন্তু কারা এসব টেলিফোন আলাপে আড়ি পাতছেন, তা ফাঁস করছেন, সেটা জানা না গেলেও দিবালোকের মত পরিস্কার কারা এসব মহৎ কাজটি করছেন , কার পক্ষে করছেন আর কাদের মুরোদ আছে এমন কাজটি করার।
তিন.

ভয়-চাপের এই নানামাত্রিক বাস্তবতার স্বাধীনচেতারা যেন কুঁকড়ে যাচ্ছেন। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ অপব্যবহার ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এমন খড়গ মাথায় থাকলে মানুষ নিজেই মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত করে ফেলে। মাথার শক্ত খুলি না থাকলেও মানুষ এখন মনে করছে কচ্ছপের মত অন্তত: নিজের মাথা আর চোখখানা যতক্ষন ঢেকে রাখা যায় ততক্ষনই নিরাপদ। জনপদে জনপদে এখন নিকষকালো অন্ধকারের দীর্ঘমেয়াদী বিস্তার ।

বলা হয় “ Power Corrupt, Absolute Power Corrupt Absolutely”. ঠিক তেমনি “ “ Gagging Media Freedom Promotes Absolute Tyranny” . মুক্ত গনমাধ্যম আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে সমাজ ও দেশ উন্নয়নের কথা বলা আর ক্রীতদাসদের জীবন দেখে সুখোল্লাস প্রকাশ করার মধ্যে কোন তফাৎ নেই। এখন মধ্যরাতের অশ্বারোহীদের প্রকাশ্য পদচারনা নেই। লেবাসধারী-লেবাসহীনদের সংঘবদ্ধ চক্র এখন নিজেরাই লাল ঘোড়ার সহিস সেজে এখানে সেখানে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তথ্যানুসন্ধানী-সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক আগেই ডীপ কোমায় চলে গেছে। এখন স্বভাবজাত নাচুনে বুড়িদের যুগ যারা কিনা সাথে ঢোলের আওয়াজ পেলে আরো বেশী উদ্বাহু নৃত্যে বয়স ভুলে নেমানান নাচে মাতোয়ারা হয়ে উঠেন।

লেখকঃ মোহাম্মদ শাহনওয়াজ
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিএমইউজে) ও সাবেক সহকারি মহাসচিব, বিএফইউজে

কোন মন্তব্য নেই