দুদকের তদন্ত চলছে
চট্টগ্রামে রেলের জমিতে মার্কেট: দোকান বরাদ্দ দিয়ে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ৩ জনের সিণ্ডিকেট

0
আইস ফ্যাক্টরী রোড়ে রেলওয়ের মালিকানাধীন জায়গায় অবৈধভাবে নির্মিত মার্কেট।

চট্টগ্রামে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের জমিতেমার্কেট নির্মাণকরে দোকান বরাদ্দের নামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধ একটি সিণ্ডিকেট।

জহির আহমেদ চৌধুরী, শাহ আলম ও আয়ুব আলী নামের সিন্ডিকেটটি রেলওয়ে পুর্বাঞ্চল থেকে ভূমি এক বছরের জন্য এ জমি ইজারা নিয়ে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণ করে বিক্রিকরে এ বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নেয়। এতে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের কয়েকশত কোটি টাকার ভূমি হাত ছাড়া হয়ে যায় বলে অভিযোগ রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের এক বছরের (একসনা) জন্য দেয়া ভূমি ইজারার শর্তে উল্লেখ রয়েছে, ইজারাকৃত (লীজদেয়া) ভূমি কোনো ভাবে বিক্রয় বা দ্বিতীয় কোনো পক্ষকে হস্তান্তর করা যাবে না। একইভাবে ভূমি ইজারা প্রদানকালিন সময়ে থাকা ভূমির অবস্থার কোনো পরিবর্তণ, পরিবর্ধণ, আর সিসি পিলার নির্মাণসহ কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা স্থাপন করা যাবেনা। তবে এই সি-িকেট ইজারার সবগুলো ভঙ্গকরে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের ভূমিতে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণ করে দোকান বরাদ্দ দেয়ার মাধ্যমে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীদি দমন কমিশন (দুদক) এর প্রাথমিক অনুসন্ধানে রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে ইজারা প্রদান, ইজারার শর্ত ভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বেড়িয়ে আসে। এই প্রতারনার সাথে রেলওয়ে চট্টগ্রামের অনেক কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এর সীমানা প্রাচীর লাগোয়া আইস ফ্যাক্টরী রোড এলাকায় রেলওয়ের মালিকানাধীন ৯৫ হাজার ৯৯২ বর্গফুট জমি ‘শাহ আলম’ নামের এক ব্যক্তি লীজ গ্রহন করে। পরে তা নগরীর আইসফ্যাক্টরী রোড ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ ও চুনার গুদাম ট্রাক মালিক সমিতি নামে ২টি সমিতি গঠন করে ওই দুই সমিতির নামে পুরো জমিটি ১ বছরের মেয়াদে লীজ দেখায়। যেখানে ২টি সমিতিরই সভাপতি জহির আহমেদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম। পরে সেই জমি দক্ষিণ জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানধীন এনএ এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি লিমিটেডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্মাণ করা হয় রেলওয়ে শাহ আমানত সুপার মার্কেট। যেখানে ২৮১টি দোকান রয়েছে।

.

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ২৮১ দোকানের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ২৫০ টি। যার প্রতিটি দোকানের অনূকূলে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। ওই মার্কেটের দোকান প্রতি সর্বনিন্ম ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধীক ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, ২৫ লাখ টাকায় ৯৯ বছরের চুক্তিতে দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রভাবশালী এই সিণ্ডিকেটের হাে ত প্রদানকৃত টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও তারা শঙ্কিত।

ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক সনা ইজারার শর্তে (লীজ এর শর্তে) উল্লেখ আছে ৩০ দিনের নোটিশে যে কোনো সময় কর্তৃপক্ষ এই লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এক্ষেত্রে লীজ গ্রহীতা বিনা শর্তে কর্তৃপক্ষকে দখল বুঝিয়ে দিতে বাধ্য থাকিবে সেই অনুযায়ী ইজারা বাতিল হলে পথে বসবে মোটা অংকের টাকা দিয়ে যারা দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন তাঁরা।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রেলের ইজারা জায়গার বিষয়ে তথ্যাদিও গোপন রাখছে খোদ বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এস্টেট বিভাগের প্রধান ইশরাত জাহান। রেলওয়ের এই বিশাল পরিমান ভূমি ইজারার তথ্যাদি জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন। তবে ওই ইজারা গ্রহীতার সাথে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল এস্টেট বিভাগের প্রধান ইশরাত জাহানের গোপন চুক্তি রয়েছে।

দুদক সুত্রে জানাযায়, গত ২ সেপ্টেম্বর আইস ফ্যাক্টরী সড়কের ওই মার্কেটে সরেজমিনে যায় দুদকের তিন সদস্যের একটি টিম। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল থেকে ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ১ জুন সাল পর্যন্ত আইস ফ্যাক্টরী রোড ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ও চুনার গুদাম ট্রাক মালিক সমিতি নামের দুই সমিতিকে ইজারা দেয়া হয় এই জমি। ৯৫ হাজার ৯৯২ বর্গফুটের জায়গাটি একবছরের জন্য ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৬৮০ টাকা ইজারা মূল্য প্রদানকরে ইজারাগ্রহীতা সি-িকেট। চলতি ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ১ জুন অর্থবছর পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ইজারার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

দুদকের তদন্ত দলের এক কমৃকর্তা জানান, জায়গাটি খুব কম মূল্যে ইজারা দেয়া হয়েছে। নিয়ম না মেনে ইজারা নিয়েই বিশাল এক মার্কেট নির্মাণ করে তারা। তবে কিভাবে ও কোন শর্ত দিয়ে এই ইজারা দেয়া হয়েছে তার কোনো তথ্য জানাতে পারেন নি স্টেট বিভাগের প্রধানসহ সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি জানতে বিভিন্ন রেলওয়ের ও সংশ্লিষ্ট অফিস সমূহকে ইতোমধ্যে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।

রেলওয়ে সুত্রে জানা গেছে, ১৯৬৬ সালের রেলওয়ে কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্সের ধারাবাহিকতায় রেলওয়ে ভূমিকে অবৈধ দখলমুক্ত রাখা, সরকার তথা রেলওয়েকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বকেয়া রাজস্ব আদায়, পরিকল্পিত বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রেলওয়ে প্রকৌশল কোড ১৯৬১ নম্বর মূলে একটি অস্থায়ী লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে মাত্র।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লম্বা সারির এ মাকের্টে ভিন্ন দোকানের মধ্যে রয়েছে স্টেশনারী, কুলিং কর্ণার, মোবাইল, ফ্রিজ টিভির দোকান, কসমেটিকস, জুয়েলারী, কাপড়ের দোকান, ফার্নিচার ও গ্রীলের দোকান, ক্রোকারিজ ও প্লাস্টিকের দোকান। এছাড়া ওয়ার্কশপ ও রড সিমেন্টর দোকান সহ রয়েছে কাঁচাবাজর মাকের্ট। এক বছরের জন্য ইজারা নেয়া ভূমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ ও বিক্রি করা যায় কিনা জানতে চাইলে আইস ফ্যাক্টরী রোড ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ ও চুনার গুদাম ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, আমরা কারো কাছে দোকান বিক্রি করিনি, ডেভলপার কোম্পানী করছে কিনা জানি না। লীজ গ্রহীতা হিসেবে আপনি এর দায় এড়াতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই প্রতিবেদকের অফিসের ঠিকানা জানতে চান এবং অফিসে এসে দেখা করে কথা বলবেন বলে লাইন কেটে দেন।

একই প্রসঙ্গে জানতে ডেভলাপার কোম্পানী এনএ এন্টারপ্রাইজ এর কর্মকর্তা আইয়ুব এর মুঠোফোনে কল দেয়া হয়। তবে আয়ুব এই প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে মোবাইল কলকেটে ফোন অফ করে দেন। পরে তাকে এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।

কোন মন্তব্য নেই