সাকিবকে যেসব প্রস্তাব দিয়েছিল ভারতীয় জুয়াড়ি দীপক আগারওয়াল

0
.

তিন অভিযোগে অভিযুক্ত সাকিব আল হাসান। তিনবারই তাকে একই ক্রিকেট জুয়াড়ি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আইসিসি সেই ক্রিকেট জুয়াড়ির নাম জানিয়েছে দীপক আগারওয়াল। ভারতীয় এই ক্রিকেট জুয়াড়ি আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট (আকসু) এর কালো তালিকাভুক্ত। তাই তার ফোন কল রেকর্ড থেকে শুরু করে চালচলন, তার থাকা-খাওয়া সবকিছু সম্পর্কে বেশ ভালই খোঁজখবর রাখছিল আকসু।

এই চিহ্নিত ক্রিকেট জুয়াড়ি ২০১৮ সালে তিনবার সাকিবকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেন। সাকিব যদিও তিনবারই সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেন। কিন্তু আইসিসিকে সেই বিষয়ে তিনি কিছুই জানাননি। এমনকি আকসু যখন তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছিল তখন তিনি সবকিছু অস্বীকার করেন। কিন্তু তার ফোন কল লিস্ট চেক করে আকসু পুরো ঘটনার সত্যতা তার সামনে ফাঁস করে দেয়। তখন সাকিবের সেটা স্বীকার না করে উপায় ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে যে বড় ভুল হয়ে গেছে!

এই জুয়াড়ি তার অপকর্মের জন্য আটকও হয়েছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারতের রায়গড় শহর থেকে আরও দুই জুয়াড়িসহ আটক হয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ে আটককৃতদের কাছ থেকে জুয়ার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদিও উদ্ধার করা হয়।

তখন ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছত্তিসগড়ের পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে জুয়াড়ি চক্রের প্রধান দীপক আগারওয়াল ও তার দুই সহযোগীকে আটক করা হয়েছে।

ওই সময়ে তাদের কাছ থেকে জুয়ার কাজে ব্যবহৃত তিনটি ল্যাপটপ, বেশ কয়েকটি মোবাইল ও ৮০ হাজার রূপি জব্দ করে পুলিশ। তবে জেল থেকে বেরিয়ে থেমে থাকেননি তিনি। চালিয়ে যান জুয়া। তিনিই সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সাকিব তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও বিষয়টি গোপন রাখায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলো আইসিসি।

আইসিসি চলতি বছর ২৩ জানুয়ারি এবং ২৭ আগস্ট দু’দফায় বাংলাদেশে এসে সাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এই জিজ্ঞাসাবাদে সাকিব আল হাসানের সামনে এমন কিছু অকাট্য প্রমাণ আকসু হাজির করে যে সাকিবের সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায়ই ছিল না। সাকিব মেনে নেন জুয়াড়ি দীপক আগারওয়াল তাকে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেটা তিনি আইসিসিকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এটা যে বড় একটা ভুল এবং আকসুর বিধি-বিধানের চরম লঙ্ঘন তাও সাকিব মেনে নেন। ক্রিকেট জুয়াড়ি দীপক আগারওয়ালের সঙ্গে একবার নয়, বেশ কয়েকবার সাকিবের টেলিফোনে কথা হয়েছে। শুধু তাই নয়, হোয়াইটসঅ্যাপে দুজনের মধ্যে অনেক তথ্য বিনিময় হয়েছে।

আইসিসি’র দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাকিব যা নিশ্চিত করেন:

১. ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে বিপিএলে ৪ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলেন সাকিব।

২. সাকিবের পরিচিত একজন ব্যক্তি আগারওয়াল নামের একজন জুয়াড়িকে সাকিবের নাম্বার দেয়।

৩. ২০১৭ এর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সাকিব আগারওয়ালের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আদান প্রদান করেন যেখানে আগারওয়াল তার সঙ্গে দেখা করার কথা বলে।

৪. ২০১৮ এর জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজন করা হয়। সেই সিরিজ চলাকালীন সময়ে সাকিব ও আগারওয়ালের মাঝে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সখ্যতা বাড়ে।

৫. ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি আগারওয়াল সাকিবকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ায় অভিনন্দন জানায়। তার পরের মেসেজেই বলেন, ‘আমরা কি এবার একসাথে কাজ করব নাকি আইপিএলের জন্য অপেক্ষা করব?’

৬. মেসেজের মাঝে থাকা ‘কাজ’ শব্দটা আগারওয়ালের পক্ষ থেকে সাকিবের জন্য দেওয়া একটা রেফারেন্স হিসেবে দেখা হয় যার বিষয়ে আকসুকে সাকিব কিছু জানায় নি।

৭. ২০১৮ এর ২৩ জানুয়ারি সাকিব আগারওয়ালের কাছ থেকে আরও একটি মেসেজ পায় যেখানে লেখা ছিল ‘ভাই আমরা কি এই সিরিজে কাজ করব?’

৮. সাকিব নিশ্চিত করে বলে যে এই মেসেজটি সেই ত্রিদেশীয় সিরিজের বিষয়ে আগারওয়ালকে জানানোর জন্য বলা হয়।

৯. সাকিব এই মেসেজের বিষয়টিও আকসুর কাছে জানায়নি।

১০. ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল সাকিব সানরাইজারস হায়দ্রাবাদের পক্ষে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে খেলে।

১১. সেই ম্যাচ চলাকালীন সময়েও আগারওয়ালের কাছ থেকে সাকিব হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পায় যেখানে একজন সুনির্দিষ্ট খেলোয়াড় খেলবে কিনা জানতে চাওয়া হয়েছিল একই সঙ্গে ভেতরের তথ্যও।

১২. পরবর্তীতেও সাকিবের সঙ্গে আগারওয়ালের কথাবার্তা চলতে থাকে। আগারওয়াল সাকিবের বিটকয়েন, ডলার একাউন্টের বিস্তারিত জানাতে বলে। এই সময়ে সাকিব আগারওয়ালের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে যেখানে একটা শব্দ লেখা ছিল ‘প্রথম’।

১৩. ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিলের কিছু ডিলিট করা মেসেজ দেখা যায় যেখানে সাকিব নিশ্চিত করে সেগুলো আগারওয়ালের মেসেজ ছিল দলীয় তথ্য দেওয়ার বিষয়ে।

১৪. সাকিব নিশ্চিত করে যে আগারওয়ালের বিষয়ে সে কিছুটা প্রতারিত বোধ করে নিজেকে এবং বুঝতে পারে যে সে একজন বুকি।

১৫. উপরের কোনো বিষয়ে সাকিব আকসুকে জানায় নি।

১৬. সাকিব আগারওয়ালের কাছে কোনো তথ্য না দেওয়ার বিষয়টিও জানায়। একই সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন না থাকার কথাও জানায়। একই সঙ্গে সে এই বিষয়গুলো আকসুর কাছে না জানানোর কথাও জানায়।

এসব বিষয়ে তথ্য প্রমাণ মেলায় সাকিবের ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আইসিসি। তবে আকসুর কাছে এ সকল দোষ স্বীকার করায় সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই