মাছ শিকারী জেলেরা যোদ্ধা, জেলেদের জাল যেন যুদ্ধাস্ত্র

0
.

জে.জাহেদ:
চট্টগ্রাম পতেঙ্গা বিচের দক্ষিণ সাগরে আনোয়ারা গহিরা উপকূলে মাছ শিকার করেন তিন জেলে মো. জাহাঙ্গীর, সাদ্দাম ও ইকবাল। বন্দরের জাহাজ চলাচলের পথে প্রায় সময় নজরকাড়ে তাদের মাছ শিকারের দৃশ্য। দূরন্ত ঢেউ কিংবা ঝড় বাতাসের ভয়ে এখানকার জেলেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেনা।  মাছ ধরার জন্য বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে এরা প্রতিদিনই ভাসায় জীবিকার তরী।

সাগরের অগভীর অংশে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ঝো বুঝে মাছের জাল ফেলে এসব জেলেরা। এরা জোয়ার ভাটায় জাল টেনে তুলে। ওদের বড় জাল গুলো প্রস্থে কয়েক হাত হলেও দৈর্ঘ্যে হাজার হাত। লম্বায় ভারি জাল টানতে অনেক জেলে লাগে। দরকার পড়ে বহু শক্তিরও। মাছ ধরা যেনো যুদ্ধ। জেলেরা যোদ্ধা, আর জেলেদের জাল যেনো যুদ্ধাস্ত্র।

.

বঙ্গোপসাগরের জলে প্রচুর মাছ। সেই মাছের লোভে ট্রলারের চারপাশে পানিতে গাঙচিলের ঝটলা। সারাদিন উড়াউড়ি জলখেলি আর মাছ শিকার। জলের মাছ শিকারে লম্বা জালকে জেলেরা বলে বেড়জাল। বেড়ার মতো চারপাশ আটকে রাখে বলে আটকে পড়ে মাছ। জাল থেকে মাছ আর বের হতে পারে না। টেনে তোলা জালে মেলে সাগরের হরেক রকমের মাছ।

জেলেরা জানান, মাছ শিকারে যাওয়া বহু ট্রলার সাগরে চলতে থাকে। জেলেদের একাংশে মাছ ধরে সাগর তটে অনেকেই। জালের দড়ি লাঠির সাথে প্যাচিয়ে একদল টানে কোমরে বেঁধে। আরেকদল সামনে থেকে হাতে টেনে তুলে জলে ফেলা জাল।আনোয়ারার সাদ্দাম বলেন, ট্রলারে বয়ে নেওয়া জাল সাগরে ফেলা হয়েছিলো বিশাল এলাকা জুড়ে। সময় ও ঝো বুঝে আবার জাল টেনে তুলে ডাঙায়। তিনি জানান, মাছ ধরার কাজটা কষ্টের হলেও মাছ শিকারের মজাটা বেশ উপভোগ করেন সব জেলেরা। যখনি জালে মাছের দেখা মিলে তখনই জেলেরা খুশিতে গান গাইতে থাকে।

গহিরা এলাকার নিবন্ধিত জেলে জাহাঙ্গীর জানান পেশাদার, মৌসুমী ও খোরাকি এই তিন ধরনের জেলেরা মাছ শিকার করে। মাছ ধরার মৌসুমে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর জেলেদের পাশাপাশি আশেপাশের উপকূলীয় জেলেরাও সাড়া দেয়। বহু জেলেরা এখানে আসে মজুরীর বিনিময়ে মাছ ধরতে। মাছের ঝো শুরু হলে সৈকতের জেলেরা মাছের জালে টান মারে। জালে টানতে টানতে গানে সুর তোলে কিশোর জেলেরা।

.

এ যেনো সাগর জলের জেলেদের জীবন জীবিকার মিতালী। সাগরের পানি থেকে জীবিকার রসদ তুলে আনার প্রতিযোগিতাও বটে। বছর জুড়ে কমবেশি মাছ ধরার জন্য এখানে জেলেরা মাছ ধরে। তবে মাছ ধরার তোড়জোড় বেশি চলে সেপ্টেম্বর অক্টোবর এপ্রিল মাসে। জলে মাছ বেশি ধরা পড়ে ডিসেম্বর থেকে ফ্রেব্রুয়ারী মাসে। পানির পরিমাণ আর মাছের ধরণ দেখে এখানকার জেলেরা মাছ ধরতে ব্যবহার করেন ছান্দি জাল, বিহিন্দা জাল, সাংলা জাল, কাপিজালসহ নানা রকমের দেশীয় জাল।

মৎস্য আহরণের কেন্দ্রস্থল হলো সাগর। সাগরে মাছ শিকারে জেলেরা সকাল দুপুর বিকেল ও রাত পর্যন্ত মাছ শিকার করে থাকেন। জোয়ার ভাটার টানে চলে জেলেদের মাছ শিকার। জাল টেনে ঘুছানো শেষ হলেই ঝুঁড়ি ছুটাছুটি আর দৌড়াদৌড়ি করে জেলেরা। জলের মাছ ঝুঁড়িতে ভরার পর দলবেঁধে একের পর এক ঝুঁড়ি ডাঙায় তুলে জেলেরা। কাঁধে ঝুঁড়ি ঝুলিয়ে পাইকারি মাছ ক্রয়কারী ব্যবসায়িরা হাজির হন সাগর তটে। এক সময় জেলেরা সৈকতের সুবিধাজনক জায়গায় ঝুঁড়ির মাছ খালাস করে। মাছ তো নয় যেনো রুপালী শস্য। সমুদ্রের মাছ যেনো বহু চেনা অচেনা। একেকবারে দেড়শ প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। এতে লইট্ট্যা, ছুরি, রুপচান্দা, চিংড়ি, ফাইস্যা, রিটা, করাত,কোরাল, শাপলা ও পিতাম্বরি মাছেই বেশি। ধরা পড়ে জেলিপিশ ও বিচিত্র মাছের ও দেখা মিলে।

জেলে ইকবাল জানান, সব শেষে ডাঙায় তোলা মাছের বাচাই। চলে। এখান থেকে পেশাদার জেলেরা দরাদরি করে মাছ কিনে নিয়ে যায়। মাছ কিনে নেয় পাইকারেরা। সমুদ্রতটেই নগদ টাকায় পরিশোধ করে জেলেদের প্রাপ্য। পরে এসব পাইকারি মাছ ব্যবসায়িরা মাছে বরফ মিশিয়ে ঝুঁড়ি ভরে ঢাকা শহরে মাছ চালান করে। এখানকার জেলেরা জানে মাছ ধরার কায়দা।

দিন নেই, রাত নেই জোয়ার ভাটার পালায় জেলেরা মাছ ধরে। সাগর আর সাগরের জলেই তাদের জীবন।

জেলেদের দাবি তাদের জন্য সরকারি সাহায্য সহযোগিতার পথ খুবই ক্ষীণ। সাগরের আয় ইনকামেই তাদের জেলে পরিবারের সুখ দুখ হাসি কান্না নির্ভর করে। ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচও যোগান দেন মাছ শিকার করে। দেশজুড়েই মাছ শিকার করে ১৫ লাখ মানুষ। এসব জেলে পরিবারের জীবন জীবিকার উৎস সাগর। জল আর জালের সাথে তাদের জীবন। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও মাছ ধরে। শতাব্দীর পর শতাব্দী মাছ শিকার চলছে সাগরেই…

কোন মন্তব্য নেই