“চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমার ভালবাসা”

0
“চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমার ভালবাসা”

জিয়া হাবীব আহ্সান, এডভোকেট:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কোন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টার ফসল নয়, এর জন্য চট্টলবাসীর প্রাণের দাবী বাস্তবায়নে যেসব ক্ষণজন্মা মানুষগুলো নানাভাবে সহায়তা করেছেন তাদের নাম আলোচনার পেছনে রয়ে গেছে।  আজ তাদের সকলের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু ক্ষনজন্মা মানুষের বহু আত্মত্যাগ ও কষ্টার্জিত ইতিহাস। চট্টগ্রাম বাসীর জন্য এটা ছিল, চাওয়া পাওয়ার একটি সোনার হরিণ। আজকের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বা নতুন প্রজন্মের হয়তো অনেকেই জানেন না এর পেছনে কত শ্রম, মেধা, ত্যাগ ও চেষ্ঠা সাধনা কাজ করেছে। ১৯৮৯ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৯তম ব্যাচ) সমাপনী উৎসবের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন কালে প্রকাশিত স্মরণীকা ‘অনুরনন’ এ এতদ সংক্রান্তএকটি তথ্যবহুল (প্রামান্য দলিলপত্র সহ) প্রবন্ধ উপস্থাপনের উদ্যোগ নিই। যা তদানিন্তন সময়ে ছাত্র-শিক্ষক ও চট্টগ্রামের বহু মনিষী, গুনীজন ও শিক্ষাবীদ আমাকে অভিনন্দিত করেন। আজ এখানে এর কিছু তথ্য তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছি। কোন এক মনীষি বলে গেছেন “Those who make history do not write history’’ অর্থাৎ যাঁরা ইতিহাস সৃষ্টি করেন তাঁরা নিজের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে যান না। হাটহাজারী এলাকার সন্তান ও উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নেপথ্য ইতিহাস এ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা আমি দীর্ঘদিন থেকে অনুভব করছি। এর জন্য যেমন মানসিক পরিপক্কতার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সমকালের জীবিত প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীদের থেকে প্রাসঙ্কিক তথ্য সংগ্রহ করা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন শেষ করার দীর্ঘ দুই যুগ পর আজ সত্য মিথ্যার দ্বন্ধের এক ক্রান্তিকালে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের দুয়েকজন সমকালীন ছাত্র নেতা যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার দেখা-অদেখা অনেক কিছুর নিরব স্বাক্ষী তাদের নৈতিক সমর্থনে আমার এই প্রয়াস। ইতিহাসের চলার বাঁকে এসব ক্ষণজন্মা পুরুষদের আবির্ভাব এবং অকুতোভয় নেতৃত্ব প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যায় সোনালী ভবিষ্যতে। মওলানা মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী মূলতঃ চট্টগ্রাম এ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ বললে মনে হয় এতটুকু অত্যুক্তি হবে না। তিনি ত্রিশ চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেয়াং পাহাড়ে একটি ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে একটি জায়গাও দান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এটি ধামাচাপা পড়লেও ষাট দশকের প্রারম্ভে যখন পুনঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হয় তখন এটা দেয়াং পাহাড়ে স্থাপনের দাবীও উঠেছিল। অপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চট্টগ্রামের তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান (১৯২৭-৫৪) ও পাকিস্তান গণ-পরিষদ সদস্য (১৯৪৭-৫৪) জনাব নুর আহমদ তথা নুর আহমদ চেয়ারম্যান খ্যাত অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য (১৯৩৭-৪৬) থাকাকালে আইন পরিষদে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী করেছিলেন। পাকিস্থান আমলে অবশ্য মাঝে মধ্যে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা উঠলেও মূলতঃ তা চট্টগ্রাম বিভাগের যে কোন জিলায় স্থাপনের দাবীও চিন্তাভিত্তিক ছিল। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্থানে সামরিক শাসন প্রবর্তন করে ২৭শে অক্টোবর সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান (বগুড়ার মোহাম্মদ আলী মন্ত্রীসভার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী- ২৫শে অক্টোবর’৫৪-১৮ই আগষ্ট’৫৫)। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণের পর পূর্ব পাকিস্থানের সাবেক আই,জি,পি জনাব জাকির হোসেনকে (রাঙ্গুনিয়া,চট্টগ্রাম) গভর্নর নিয়োগ করেন। জনাব জাকির হোসেন গভর্নর হওয়ার পর (১৯৫৮-৬০) চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত জননেতা আলহাজ্ব এ,কে,এম ফজলুল কাদের চৌধুরীকে তাঁর প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন এবং একই সাথে একটি উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন করেন। এতে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনাব আবদুর রহমান মিঞা (অবসর প্রাপ্ত স্কুল পরিদর্শক), শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী জনাব বাদশা মিঞা চৌধুরী টি,কে,ও জনাব ও,আর,নিজাম (চট্টগ্রাম পৌরসভার এককালীন ভাইস চেয়ারম্যান ১৯৫৮-৬৫) প্রমুখ সদস্য ছিলেন। এই সময় তৈরী হচ্ছিল দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় সর্বজনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী ও জাকির হোসেনের আপ্রাণ প্রচেষ্ঠায় চট্টগ্রাম বিভাগে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয় (অবশ্য কোন জিলায় তা স্থাপিত হবে তার কোন নির্দিষ্ট বক্তব্য ছিলনা)। ১৯৬০ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নেতৃবর্গ, সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগীগণ জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীর পাহাড়শীর্ষস্থ ভবনে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে স্থাপনে তাঁর (জনাব চৌধুরীর) বিশেষ হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এই বৈঠকে সর্বজনাব শেখ রফিউ উদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, অধ্যাপক এ,বি,এম সুলতানুল আলম চৌধুরী (সাবেক এম পি এ ১৯৫৪-৫৮), কবি আবদুস ছালাম (সম্পাদক, অধুনালুপ্ত দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান), সুলতান আহমদ ( সাবেক মন্ত্রী, অধুনালুপ্ত পূর্ব পাকিস্তান ১৯৬৪-৬৯), বাদশা মিঞা চৌধুরী টি,কে, ও,আর,নিজাম, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বক্তেয়ার মিঞা, অধ্যক্ষ এ,এ রেজাউল করিম চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ হোসেন, এডভোকেট সুলতান আহমদ (সাবেক এম.এন.এ ১৯৬৫-৬৯), এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (সাবেক এম.এন.এ ১৯৬৫-৬৯), আলহাজ্ব এম,এ জলিল (সাবেক এম.পি.এ ১৯৬২-৬৫), আলহাজ্ব ইসলাম মিঞা ( সাবেক এম. পি. এ ১৯৬২-৬৫), ব্যারিষ্টার সাইফুদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, এম,বদরুল ইসলাম খান চৌধুরী প্রমুখ ছাড়াও ছাত্রনেতাদের মধ্যে সর্বজনাব মোহাম্মদ হোসেন খান, এ,বি,এম খায়রুল আলম, মুহাম্মদ আশরাফ খান, মুহাম্মদ মুহসীন, মঈদুর রহমান চৌধুরী ও আবু বকর চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, এই সময়ের মধ্যে জনাব চৌধুরী গভর্ণরের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে দিয়েছেন এবং সামরিক সরকার কর্তৃক অন্যান্য জাতীয় নেতৃবর্গের সাথে এবডো তথা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য ঘোষিত হন। অপরদিকে ১৯৬০ এর শেষের দিকে জনাব জাকির হোসেনকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় খাদ্য মন্ত্রী লেঃ জেনারেল মুহাম্মদ আজম খানকে (সামরিক শাসনের অন্যতম স্থপতি) এখানকার গভর্ণর পদে নিয়োগ করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের সংগঠক অধ্যাপক আহমদ হোসেন স্যার। তার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সংগ্রাম আন্দোলনে সহকর্মী ছিলেন আলাদীন আলি নূর । তিনি তাড়াহুড়ো করে মিটিং স্থলেই একে দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনের প্রকৃত কারণ দেখিয়ে এর মানচিত্র ও এর স্থান নির্দেশনা । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংগ্রাম আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের কাতারের নেতা ।তিনি ছিলেন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক । বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবীতে লালদীঘির মাঠে চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সব এসেম্বলি মেম্বারদের নিয়ে জনসভা করেছিলেন । প্রথমদিকে এ বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালিতে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলেও ১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর, রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রীসভার এক বৈঠকে সভাপতিত্বকালে ফজলুল কাদের চৌধুরী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এ.টি.এম মোস্তফাকে বিশ্ববিদ্যালয়টি কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। কুমিল্লায় জনগণ চেয়েছিলেন এটা কুমিল্লায় হোক , কিন্তু তিনি যে আপোষহীন ভূমিকা নিয়েছিলেন এটা চট্টগ্রামে স্থাপনে তা দৃষ্টান্ত তুল্য হয়ে থাকবে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে । তিনি সিটি কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের সম্পৃক্ত করেছিলেন এই আন্দোলনে । আশ্চর্যের কথা বিশ্ববিদ্যালয় হবার পর কোনোদিন ঐ মূখী হয়েছিলেন কিনা জানা যায়নি । এতোটাই প্রচার বিমুখ ছিলেন – জাহির করতেননা নিজেকে । ১৯৬১ সালের ৭ মে চট্টগ্রামে তৃতীয় বিশ্ববিদালয় স্থাপনের দাবিতে যে সাংগঠনিক সভা হয়, সে সভায় জনাব বাদশা মিয়া চৌধুরীকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংগঠনিক পরিষদের সভাপতি ও অধ্যাপক আহমদ হোসেনকে আহবায়ক নির্বাচিত করা হয়েছিল। এই পরিষদের আহবায়ক হিসেবে তিনি চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে সেই সময় জনপ্রিয় করে তোলেন।সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তিনি নিজে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, গভর্নর ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্মারকলিপি প্রদানের জন্য বেশ কয়েকবার করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোর সফর করেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের মূল সংগঠক দের একজন । কিন্তু কেন জানি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ,সরকার অথবা কোণো মহল তার এই অবদানটুকু সেভাবে মূল্যায়ন করেনি । পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার আর ক্ষমতা , অর্থের জোয়ারে ভেসে গেছে এইসব নীরব কর্মবীরের কীর্তি । ভূলে গেছে মুল নেপথ্য নায়কদের কথা । এখন বিশ্ববিদ্যালয় বলতেই চট্টগ্রামের কিছু মানুষ বুঝে এটা তৎকালীন স্পীকার মরহুম ফজলূল কাদের চৌধুরীর কলমের এক খোঁচায় হয়েছে , বাস্তবে এর পিছনে রয়েছে সংগ্রাম আর আন্দোলনের ইতিহাস । মরহুম অধ্যাপক আহমদ হোসেন আমাদের মাঝে নেই , তার চাওয়া পাওয়ার ও কিছুই নেই । জীবিত কালেও আমরা এই কাজের জন্য তাকে সামান্য স্বীকৃতি দেই নি, তিনি চান ও নি । বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে মেধা চর্চার তীর্থ কেন্দ্র ,দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ । বিশাল এই স্থাপনা র একটি অংশে একটা ইট এর স্তম্ভ দিয়ে আমরা কি এদের সম্মানিত করতে পারিনা ? আমরা যদি নিজেরা নিজেদের প্রচারে মত্ত থাকি তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত গুণীদের সম্বন্ধে কিছুই জানবে না – দায়বদ্ধ থাকবেনা দেশের ও মাটির প্রতি । বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ব্যাপারে চাইলে উদ্যোগ নিতে পারে । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে ‘‘বিভাগ’’ শব্দটি সংযুক্ত থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ করে সিলেট ও কুমিল্লা জিলাদ্বয়ও আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ছাত্রদের দ্বারা ঘেরাও হন (৩রা ফেব্রয়ারী ১৯৬২)। অবস্থা বেগতিক দেখে গভর্নর আজম খান গাড়ী থেকে বের হয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় ঘোষণা দেন- ‘‘এয়ে থার্ড ইউনিভার্সিটি হযরত শাহ জালাল (রাঃ) ক্যা মুলক সিলেটমে হুগা’’। অর্থাৎ হযরত শাহজালাল (রাঃ)’র দেশ সিলেটেই তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবে (দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদী /৫ই ফেব্রয়ারী ১৯৬২)। এদিকে চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে সর্বজনাব ফজলুল কবীর চৌধুরী (সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ১৯৬২-৬৫ ও ১৯৬৭-৬৯), আবুল খায়ের সিদ্দিকী ( সাবেক এম.পি.এ ১৯৬৫-৬৮), বাদশা মিঞা চৌধুরী, আজিজুর রহমান (সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ১৯৬২-৬৫), আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক (দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক), অধ্যাপক এ,বি,এম সুলতানুল আলম চৌধুরী (সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ১৯৫৪-৫৮), অধ্যাপক মুহাম্মদ খালেদ (সাবেক সংসদ সদস্য ১৯৭০-৭৫, বাকশাল জেলা গভর্নর ১৯৭৫, সম্পাদক দৈনিক আজাদী ও ৭২’র সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য), অধ্যাপক আহমদ হোসেন এবং ছাত্রদের পক্ষ থেকে সকল স্কুল ও কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএসগণ প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপনের দাবী জানিয়ে দৈনিক আজাদীতে বিবৃতি প্রদান করেন (৬ ফেব্রয়ারী ১৯৬২)। ১৯৬২ এর ২৮ শে এপ্রিল সামরিক শাসনের অধীনে পাকিস্থান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদদ্বয়ের (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এটি ছিল নির্দলীয় ও মৌলিক গণতান্ত্রিক ভিত্তিক। তৎসময়ে সংগৃহীত চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রার্থীর (বিশেষ করে জাতীয় পরিষদের ৫টি আসনের প্রার্থীগণ) নির্বাচনী কর্মসূচীতে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কোন ভূমিকা তাঁরা রাখতে ব্যর্থ হন। শুধুমাত্র জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁর বিশাল নির্বাচনী এলাকায় (সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা) দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ্যে ঘোষনা করেন- ‘‘আমি নির্বাচিত হই আর না হই, তবে বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে স্থাপনের সকল প্রচেষ্টা আমি নেব এবং ইনশাল্লাহ আমার এই উদ্যোগে সাফল্য অর্জন করবই।’’ (বিভিন্ন নির্বাচনী বক্তৃতা ও নির্বাচনী কর্মসূচীর সাক্ষাৎকারে, দৈনিক মর্নিং নিউজ, আজাদ ও আজাদী ১৫ থেকে ২৫ শে এপ্রিল ১৯৬২)। জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৬২-র মে মাসে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে জনাব চৌধুরীকে এক বিশাল নাগরিক সম্বর্ধনা দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জনাব রফিউ উদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী (সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম পৌরসভা ১৯৫৮ ও গণপরিষদ সদস্য ১৯৪৬-৫৪) প্রদত্ত মানপত্রের জবাবে জনাব চৌধুরী প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষনা করেন ‘‘মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করি আর না করি তবে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ছাড়ব’’। ১৯৬২-র ১৩ই জুন জনাব চৌধুরী পাকিস্থানের খাদ্য, কৃষি, পূর্ত, ত্রাণ ও শিক্ষা ও তথ্য দপ্তরের মন্ত্রী হন। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আশার আলো জ্বলে উঠল। ইতিমধ্যে সর্বজনাব বাদশা মিঞা চৌধুরী, আবুল খায়ের সিদ্দিকী, ফজলুল কবির চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিত্বশীল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবীতে বেশ কয়েকটি জনসভাসহ আন্দোলনকে জোরদার করে তুলে। ১৯৬২-র ১৭ই সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত চট্টগ্রাম সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর সাথে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরী মহাবিদ্যালয় স্থাপনের দাবীও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৬২-র ১৫ই জুলাই চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজের পক্ষে জনাব চৌধুরীর সাথে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এক বৈঠকে মিলিত হয়ে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবী জানালে তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই চট্টগ্রামে স্থাপিত হবে। অক্টোবর জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্য জনাব মাহবুবুল হক (নোয়াখালী) চট্টগ্রাম বিভাগে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অগ্রগতি সম্পর্কে এক প্রশ্ন উত্থাপন করলে শিক্ষামন্ত্রী জনাব চৌধুরী বলেন, ‘‘মাননীয় সদস্য চট্টগ্রাম বিভাগ বলে ভুল বলছেন। এটি চট্টগ্রাম জিলায় স্থাপিত হবে এবং এর জন্য কেন্দ্র থেকে ইতিমধ্যে ৬০ লক্ষ টাকা মঞ্জুরী দেয়া হয়েছে।’’ (দৈনিক আজাদী ও দৈনিক ডন/ ২০ অক্টোবর ১৯৬২)। অপর দিকে কুমিল্লা জিলা হতে জনাব মফিজ উদ্দিন আহমদ প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী (১৯৬২-৬৫) হওয়ায় কুমিল্লায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের জোর লবিং ও আন্দোলন শুরু করেন। সিলেটবাসীও তাদের দাবীতে সোচ্চার হয়। সিলেটবাসী দৈনিক ডনের সম্পাদক জনাব আলতাফ হোসেন (পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ১৯৬৫-৬৯) এক সম্পাদকীয়তে লিখেন- ‘‘পূর্ব পাকিস্থানে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম বিভাগে স্থাপনের প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কেননা প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী জনাব মফিজ উদ্দিন আহমদ হলেন কুমিল্লার লোক। তদুপরি এ ব্যাপারে প্রাদেশিক সরকারই সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকারী, তবে চূড়ান্তসিদ্ধান্তের মালিক হন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (এন,ই,সি)। দেখা যাক কে হারে কে জেতে। তবে নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, চট্টগ্রাম জিলা এ ব্যাপারে প্রাধান্য পাওয়ার সার্বিক যোগ্যতা রাখে (২রা নভেম্বর ১৯৬২)। ১৯৬২-র ৩০শে ডিসেম্বর তৎকালীন ন্যাশনাল ষ্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এনএসএফ) চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এ,কে,এম, আবু বকর চৌধুরী’র নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবীতে ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় এবং ৮ই জানুয়ারী (১৯৬৩) চট্টগ্রামে পূর্ণদিবস হরতাল পালন করা হয়। অপরদিকে প্রাদেশিক গভর্ণর জনাব আবদুল মোমেন খানও (১৯৬২-৬৯) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে সিলেট কুমিল্লার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এমনি এক নাজুক অবস্থায় জনাব চৌধুরী মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়ে জাতীয় পরিষদের স্পীকার নির্বাচিত হন (২৯শে নভেম্বর ১৯৬৩-১লা জুন ১৯৬৫)। অবস্থা বেগতিক দেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সাথে রাওয়ালপিন্ডি, ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকদফা বৈঠক করলেও কোনরকম ইতিবাচক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। পাকিস্থানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৬৩-র ১২ই ডিসেম্বর ঢাকায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার বৈঠকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব এ,টি,এম মোস্তফাকে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং চট্টগ্রামের নাগরিক সম্বর্ধনা সভায় দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষনা করেন ‘‘তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম জেলায় স্থাপিত হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশও আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি’’ (দৈনিক আদাজী/ ১৪ই ডিসেম্বর’১৯৬৩)। ১৯৬৪-র মার্চে পাকিস্থানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের সভায় সভাপতিত্ব করা কালে চট্টগ্রাম জিলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও অনুমোদন করেন। ইতিমধ্যে ১৯৬৪-র ১০মে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে সর্বজনাব ফজলুল কবির চৌধুরী (স্বতন্ত্র), জাকেরুল হক চৌধুরী (আওমামী লীগ), এম,এ জলিল (মুসলিম লীগ), আজিজুর রহমান (মুসলিম লীগ), আলহাজ্ব ইসলাম মিঞা (মুসলিম লীগ) এক যৌথ প্রস্তাবে তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপনের জোর দাবী জানান এবং শিক্ষামন্ত্রী মফিজউদ্দিন আহমদের নেতিবাচক উত্তরে চট্টগ্রাম জেলার সকল এম,পি,এ ওয়াক আউট করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নে গভর্নর আবদুল মোমেন খান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বিভাগের জেলা নেতৃবৃন্দের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন। এতে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, সিলেটবাসীগণ বৈদেশিক অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ জোগানের প্রস্তাব দেয়ায় গভর্নর সাহেব এতে মৌন সম্মতি দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে, সিলেটেই তা স্থাপিত হবে। অবস্থা বেগতিক দেখে জনাব আবুল খায়ের সিদ্দিকী ও আবু বকর চৌধুরী তৎকালীন গভর্নরের মিলিটারী সেক্রেটারী কর্নেল ইস্কান্দর করিমের (গহিরা রাউজান নিবাসী) কক্ষে ঢুকে রাওয়ালপিন্ডীতে জনাব চৌধুরীর বাসায় যোগাযোগ করলে জানানো হয় যে তিনি কোপেনহেগেনের পথে হয়ত করাচীতে আছেন অথবা রওয়ানা হয়ে গেছেন। সেই এক চরম মুহূর্তে মিলিটারী সেক্রেটারীকে বলা হয় করাচী এয়ারপোর্টে যোগাযোগ করার জন্য এবং তাই করা হলে জনাব চৌধুরীকে সাংবাদিক সম্মেলনে ভাষণরত অবস্থায় পাওয়া গেল। জনাব আবুল খায়ের সিদ্দিকী বিস্তারিত জানানোর পর তিনি গভর্ণরের সাথে কথা বলেন। টেলিফোনে যেই কথা বলে তা তারা মিলিটারী সেক্রেটারীর কক্ষ থেকে ওভার হেয়ারিং করেন এবং চৌধুরী সাহেব বলেন যে, ‘‘আমি কোপেনহেগেন থাকাকালীন শুনতে চাই যে, আপনি চট্টগ্রামেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা ঘোষণা দিয়েছেন’’। উল্লেখ্য, জনাব চৌধুরী তখন কোপেনহেগেন আন্তঃসংসদীয় সম্মেলনে অংশগ্রহনের জন্য পাকিস্থান ত্যাগ করেন (মে ১৯৬৪)। জনাব চৌধুরীর সাথে টেলিফোনে আলাপের পর গভর্নর সাহেব জনাব সিদ্দিকীকে ডেকে বললেন, ‘‘তোমরাতো আমাকে অপমান করলে। ঠিক আছে প্রাথমিক ফান্ড হিসাবে চট্টগ্রাম থেকে আজকের মধ্যে নগদ ২৫ লক্ষ টাকা দিতে হবে। (নির্দেশানুযায়ী) জনাব সিদ্দিকীসহ অন্যান্য নেতৃবর্গ ফান্ড যোগাড়ের জন্য বের হয়ে জনাব সুলতান আহমদ, এম,এ জলিল, হাজী রাজ্জাক, হাজী জানু, আলহাজ্ব ইসলাম খান, এম,এম ইস্পাহানী মির্জা, আবু আহমদ প্রমুখ ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ হতেই এই ফান্ড সংগ্রহ করা হয়। আজকে আমি তাঁদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ১৯৬৫-র ১৭ই জানুয়ারী পিন্ডিতে জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপনের সিদ্ধান্তগৃহীত হয় এবং পরের দিন জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলে অর্থ অনুমোদন দেয়া হয়। এই বৈঠকেও তিনি সভাপতিত্ব করেন। তখন তিনি পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। একদিকে সকল প্রতিকূলতার মাঝেও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে একক প্রচেষ্ঠায় জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী অপরদিকে স্থানীয়ভাবে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে সর্বজনাব বাদশা মিঞা চৌধুরী, আবুল খায়ের সিদ্দিকী, ফজলুল কবির চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ হোসেন প্রমুখ শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবী, রাজনৈতিকবর্গ চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে যেই অবদান রেখে গেছেন তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে। ১৯৬৬-র ১৮ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন। এর প্রজেক্ট ডাইরেক্টর পরবর্তীতে প্রথম উপাচার্য হিসাবে ড.আজিজুর রহমান মল্লিক (বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ১৯৭৪-৭৫) বিশ্ববিদ্যালয় প্রজেক্টের বাস্তবায়নে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মাত্র ১১ মাস সময়ে অত্যন্তদক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে অক্লান্তপরিশ্রম করেছেন। পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে (১৩ই জুন’১৯৬২- ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৬৩) জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী এক আদেশ বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি ড. ওসমান গণিকে আহ্বায়ক করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্তএকটি কমিটি গঠন করেন। এতে এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদা (বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকার কর্তৃক গঠিত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান) নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থান নির্বাচনী কমিশন গঠন করেন। এটি ১৯৬২-৬৩ পর্যন্তচট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। ১৯৬২’র নভেম্বর এই কমিশন চট্টগ্রাম আসেন এবং ১২ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান স্থান পরিদর্শন করেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ড. কুদরত-ই-খুদা এই স্থান উপযুক্ত বলে রিপোর্ট দেন । এক্ষেত্রে তার অবদানও প্রণিধানযোগ্য। তাছাড়া স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্বাচিত বর্তমান স্থানটি দখলের ব্যাপারে বহু বাধা বিপত্তি অতিক্রমে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব আলী আহমদ টি,কে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করেন মর্মে জানা যায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে বলে আজ যেমন জাতীয় জীবনে অবক্ষয় নেমে এসেছে তেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস তথা এর প্রতিষ্ঠার দাবীতে সংগ্রামের ইতিহাসগুলোকে বিকৃত করার অপচেষ্টা করে পরোক্ষভাবে চট্টগ্রামের মৌলিকত্বকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। আজ দ্বিধাহীন চিত্তে ভবিষ্যত বংশধরের কাছে ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করছি যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন উপ-মহাদেশের অন্যতম জননেতা মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী আর প্রস্তাবক হলেন- অপর জননেতা নুর আহমদ চেয়ারম্যানখ্যাত নুর আহমদ এবং এই মহান নেতৃদ্বয়ের স্বপ্ন ও প্রস্তাবনার রূপকার হলেন উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী যিনি ক্ষমতা সদ্ব্যবহার করে চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯তম সমাপনী উৎসবের আহ্বায়ক হিসেবে উক্ত ব্যাচের একজন ছাত্র এবং হাটহাজারী এলাকার সন্তান হিসেবে আমি যেসব সমকালীন ব্যক্তিত্ব এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি এ প্রবন্ধ রচনায় যিনি আমাকে সমাপনী উৎসব কালে তথ্য দিয়ে দোয়া, স্নেহ ও ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন তিনি হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা জনাব এ,কে,এম আবু বকর চৌধুরী (জীবন সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রেজিষ্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, জীবন সদস্য বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, সাবেক দফতর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ (১৯৭৩-৯০) ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শেষ মুজিব গণ-পাঠাগার, গহিরা, রাউজান, চট্টগ্রাম- ১৯৭২-৯০) এর প্রতি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এসব মহৎপ্রাণদের অবদান পূর্ণিমার চাঁদের মতো চিরকাল উদ্ভাসিত থাকবে। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁদের প্রত্যেকের এ ত্যাগ ও কুরবানী কবুল করুন, আমীন।

লেখকঃ আইনবীদ, মানবাধিকার সংগঠক ও সুশাসনকর্মী।

প্রবন্ধকারঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও ১৯তম ব্যাচের সমাপণী উৎসবের আহ্বায়ক।

কোন মন্তব্য নেই