আজ শুধুই ভালোবাসা-বাসি

0
.

আমি ভালোবাসি শুধু একজনকে সুন্দর এই পৃথিবীতে…বা যে টুকু সময় তুিম থাকো পাশে/ মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে/ বাকিটা সময় যেন মরণ আমার…গানের বিখ্যাত কলি অথবা “তুমি আমায় এক মুঠো ভালোবাসা দাও, আমি তোমায় পৃথিবীটা দিয়ে দেব” কবিতার পঙ্থিমালায় আবেগাশ্রিত কথাগুলো প্রতিকী অর্থে বহুল ব্যবহৃত হলেও প্রেয়সীর মন পাওয়ার জন্য জীবনবাজী রাখার নজীর ইতিহাসে ভূরি ভূরি। পুরো রাজ্য বা যা কিছু অর্জন তার সব কিছু উজাড় করে দেয়ার মতো এক পায়ে খাঁড়া এমন ভালোবাসার কাঙ্গালের সংখ্যা কিন্তু সমাজে নেহায়েত কম নয়। সম্রাট শাহজাহানের আগ্রার তাজমহল কিন্তু আজো ভালোবাসার এক অমর কৃর্তী হয়ে আছে। কিছু কিছু সময় প্রেয়সীর ভালোবাসায় বিলীন হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে আবেগ তাড়িত করে তুলে, তেমনি “তুমি আমার প্রথম সকাল/ একাকী বিকেল ক্লান্ত দুপুর বেলা/ তুমি আমার সারা দিনমান/ তুমি আমার সারা বেলা” এই গানের আবেদন কিন্তু অসাধারণভাবে আপনাকেও বিমোহিত করে তুলবে।

ভা-লো-বা-সা চারটি অক্ষর সমৃদ্ধ ছোট্ট একটি শব্দ ‘ভালোবাসা’। অথচ এই শব্দটিই কিন্তু প্রচণ্ড শক্তি ধারণ করে। যে শক্তির জোরে অসম্ভবকে সম্ভব, অজেয়কে জয় করা যায়। দূর কে কাছে, পর কে আপন করে নেয়। আমরা বুঝি আর না বুঝি, দেখি আর না দেখি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই কিন্তু বিভিন্ন সম্পর্ক আবর্তীত হয়। “তোমার এক চিমটি নির্মল ভালোবাসা পেলে ঐ দূর আকাশের চাঁদটাও আমি তোমায় পেড়ে দেব” কবিতার মতো ভালোবাসা অনুভবের ব্যাপার। ভালোবাসা শব্দটি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ। কারও প্রতি অনুরক্ত হয়ে যেখানে ‘ভালো’ চিন্তা ‘বাসা’ বাধতে চায় সেখানেই ‘ভালোবাসার’ জন্ম। ‘ভালো’ আর ‘বাসা’ দুটি শব্দ এক সাথে লীন হয়ে যাওয়ার মধ্যেই ভালোবাসার শক্তি নিহিত। যাকে আমরা এক কথায় ভালোবাসা বলি। দু’টি খণ্ডিত অংশের পূর্ণাঙ্গ রূপ হচ্ছে ভালোবাসা। যদি আরও খোলাসা করে বলতে হয় তাহলে বলা হবে, কারও মনে যখন অন্য কারও সম্পর্কে ভালো কিছু ভাবনা বাসা বাঁধে তখনই ভালোবাসা সৃষ্টি হয় অথবা সম্পর্কটি তখন ভালোবাসায় রূপান্তরীত হয়। ফুটবল খেলায় যখন একটি দলের জয় ছাড়া অন্য কোন গত্যান্তর থাকেনা তখন ঐ দলটি জয়ের জন্য অল আউট পদ্ধতিতে খেলে তেমনি ‘ভালোবাসায় যদি থাকে ওগো ভয়/ সেই সম্পর্কের হয়নাতো জয়/ ভয় তাড়িয়ে এসো হাত ধরি/ হয়তো পাবো নয়তো মরি’ এই গানটির ভাবার্থ ভালোবাসার অল আউট মানসিকতাকে তুলে ধরছে।

.

ভালোবাসা হচ্ছে মনের আবেগীয়, হৃদয় ঘটিত আত্মীক ব্যাপার। ভালোবাসা কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়, ভালোবাসা ওজনে পরিমাপ করেও দেখা যায় না। আবার ইঞ্চি টেপ নিয়ে দৈর্ঘ্য প্রস্থ মেপে দেখারও কোনো সুযোগ নেই। এটা শুধুই অনুভবের ব্যাপার। তা আপনি মন বা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন, মস্তিস্কের সেনসেটিভ কোষগুলো দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন অথবা মন আর দৃষ্টিশক্তির সমন্বয়ের কল্যাণে পরিমাপ বা ধারণা লাভ করতে পারেন। তবে হাসি-কান্না, মান-অভিমান, চাওয়া-পাওয়া, ভালো থাকা-মন্দ থাকা সব কিছুকে কেন্দ্রকরেই ভালোবাসা আবর্তীত হয়। বলা যেতে পারে সব মিলিয়ে ভালোবাসা হচ্ছে একটি অদৃশ্য বায়বীয় আবর্তীত ঘূর্ণি। যে ঘূর্ণির পাকে পড়লে একটি ছেলে, একটি মেয়ে বা একজন পুরুষ একজন নারী তার জীবনের সবকিছু হারাতেও দ্বিধা বোধ করেনা। ভালোবাসার চাওয়া-পাওয়া, গান আর কবিতা যখন এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয় তখন “যদি মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে দাঁড়িয়ে/ একফোটা পানির হাহাকারে কণ্ঠনালি শুকিয়েও যায়, তবে যাক/ তবুও তুমি আমার/ তোমার বাবার লেলিয়ে দেয়া মানুষ নামের হায়েনাদের/ বন্ধুকের নলের মুখে যদি জীবন যায় যাক/ তবুও তুমি আমার।” কবিতার পঙ্থিমালার মতো এমন নাছোড়বান্দা প্রেমিক বা প্রেয়সীও কিন্তু সমাজে কম নেই। অথবা ভারতীয় বাংলার বিখ্যাত গান তবুও তুমি আমার এর কয়েকটি লাইন এখানে না এনে থাকতে পারছিনা, “যদি প্রশান্ত মহাসাগরের এক ফোটা জল আর নাও থাকে/ যদি নিভেও যায় কোনদিন/ যতটুকু আলো আছে, ঐ সূর্য্য আর চাঁদের/ যদি সাইবেরিয়ার তুষারে কখনো সবুজ ফসল ফলেও যায়… তবুও তুমি আমার” গানের অর্থই বুঝিয়ে দেয় মানুষের জীবনে ভালোবাসা কতটা আকাঙ্খিত বস্তু। অনেকের জীবনেইতো হিন্দি ছবির বিখ্যাত গানের মতো ‘পেহেলি নজর মে ক্যায়সা যাদু করদিয়া…প্রথম দেখায় ভালোবাসায় পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে যাওয়ার প্রমাণ ভুরি ভুরি।

প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পারিবারিক বা অন্যান্য ভালোবাসার সম্পর্কের বন্ধনটাও দৃঢ় বা উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণা লাভ করে। সম্পর্কের গভীরতার উপর নির্ভর করে বিশেষ বিশেষ ঢঙে, আপন ইচ্ছেয় প্রাণোচ্ছল বর্ণিল সৌন্দর্যে পালন করা হয় দিনটি। প্রেমিক যুগলরা এদিন ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে…’ গানের সার্থকতা প্রমাণ করতেই যেন উঠে পড়ে লাগে। কবির প্রেমিক মনও এখানে আবেগীয় হতে পিছিয়ে থাকবে কেন? তাইতো কবির ভাষায় সুন্দর করে ফুটে উঠেছে ‘হাত বাড়িয়ে ছুঁইনা তোকে মন বাড়িয়ে ছুঁই/ দুই কে আমি এক করিনা এককে করি দুই’। আমরা এক কথায় বলতে পারি প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে নির্ভরতার স্বপ্ন দেখার একটি অন্যতম প্রধান দিন হচ্ছে ভালোবাসা দিবস। এদিন ভালোবাসা বিনিময় করা হয়। এদিনটিতে মনের আবেগ প্রকাশ করার জন্য সবাই উজ্জীবিত হয়ে উঠে। একে অপরকে যেন একটু বেশীই ভালোবাসে।

প্রেমের একটি নির্দিষ্ট গন্ডি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু ভালোবাসা অসীম। দশের ভিতর এক আছে কিন্তু একের ভিতর দশ নেই, তেমনি প্রেম একমূখী বা এক কেন্দ্রীক কিন্তু ভালোবাসা বহুমাত্রিক। সংগীতে যেমন তাল, লয়, সুর আছে, কবিতায় যেমন ছন্দ, মাত্রা আছে ভালোবাসায়ও তেমনি নিজস্ব ছন্দ আছে। ভালোবাসা বিশ্বজনীন, ভালোবাসা সর্বজনীন। ভালোবাসা হচ্ছে এই রোদ এই বৃষ্টি। রাগ-ক্ষোভ-মান-অভিমানের মধ্যেই একদিন সত্যিকারের ভালোবাসা এসে ধরা দেয়। কবির ভাষায় ‘নীল নীল ভালোবাসায় কে পরিতে না চায়, হে কে পরিতে না চায়’। ভালোবাসা আর মন একে অপরের পরিপূরক। ভালোবাসার উল্টো দিকটি সম্পর্কেও আমাদের জানা আছে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে ভূমিকম্পন যেমন একটি শহর বা নগরীকে প্রচন্ড ধ্বংস্তুপে পরিণত করে, সাইক্লোনের প্রচন্ডতায় যেমন একটি দেশ মুহূর্তেই লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে তেমনিভাবে ভলোবাসার বেদনায় ক্লিষ্ট হয়ে একটি সুন্দর মন মুহূর্তেই অন্ধকার ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে পারে।

প্রেম-ভালোবাসা আমাদের দেশের ঋতু বৈচিত্রকেও গানে গানে গানে ছুঁয়ে যায়। ‘এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনায়/ জ্যৈষ্ঠতে হলো পরিচয়। আসছে আষাঢ় মাস/ মন তাই ভাবছে কি হয় কি হয়, কি জানি কি হয়।’ ভালোবাসা যেন বর্ষা ঋতুকে ভালোভাবেই আলিঙ্গন করেছে, ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না যে মন/ ঝড়ে ঝড়ে ঝড়ো ঝড়ে ঝরেছে/ তোমাকে আমার মনে পড়েছে।’ এই গানের সুরে নষ্টালজিক হয়ে পড়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মন। “অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে, যেন এক মুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে, তুমি এলে” এই গান শোনার পর কথার রেশ আর খুঁজে না পাওয়াই হলো ভালোবাসার স্বাভাবিকতা।

ভালোবাসা নিরন্তর, ভালোবাসা পবিত্র, ভালোবাসা বায়বীয়, ভালোবাসা স্বর্গীয়। কিন্তু কখনো কখনো প্রতারণা ভালোবাসাকে কলুষিত করে তাই বলে সামান্য কিছু নষ্ট বিবেকের কারণে ভালোবাসার মতো মহৎ একটি বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ভালোবাসার মিষ্টি ছোঁয়ায় একটি নষ্ট জীবন সুন্দর হয়ে উঠতে পারে আবার বিপরীত দিকে দেখা যায় প্রতারণা বা ছলনাপূর্ণ ভালোবাসার ফাঁদে পড়ে একটি সাজানো-গোছানো সুন্দর জীবনও নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই নির্দিধায় বলা যায় ভালোবাসা যেমনি দুহাত ভরে দেয় তেমনি আবার সবকিছু কেঁড়েও নেয়। একটি বিখ্যাত গানের দু’টি কলি উদ্ধৃত করে ভালোবাসাময় এ লেখার ইতি টানতে চাই। ‘ভালোবাসায় কেউ হাসতে পারেনা সারাক্ষণ/ দুঃখ তার পাশে থাকে, ভালোবাসায় কেউ কাঁদতে পারেনা সারাক্ষণ/ সুখেও গা ভাসাতে পারে…, ভালোবাসায় তুমি বদলে দিতে পার/ একটি নষ্ট মন, ভালোবাসায় তুমি কেড়েও নিতে পার/ একটি সুন্দর জীবন…।’ ভালোবাসা কখনোই একতরফা হয় না। কাউকে ভালোবাসা দিলেই তবে ভালোবাসা পাবেন। সো- ভালোবাসতে থাকুন এবং ভালোবাসাময় জীবনের সাথে নিজেকে রাঙ্গিয়ে রাখুন। আর প্রাণ খুলে বলুন, …ভালোবাসি-ভালোবাসি-ভালোবাসি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার।
E-mail & facebook: hasan737252@yahoo.com

“পাঠকের কলাম” বিভাগের সকল সংবাদ, চিত্র পাঠকের একান্ত নিজস্ব মতামত, এই বিভাগে প্রকাশিত সকল সংবাদ পাঠক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। তা্ই এ বিভাগে প্রকাশিত কোন সংবাদের জন্য পাঠক.নিউজ কর্তৃপক্ষ কোনো ভাবেই দায়ী নয়।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন