পোশাকে একুশের চেতনা

0

একুশ মানেই শুধু ভাষার জন্য লড়াই নয়, একুশ মানেই রক্তস্নাত ফাল্গুনের দুপুর নয়। ভাই হারানোর বেদনা আর শোক ছাপিয়ে একুশ আমাদের অনেক পাওয়ার একটি দিন। একুশের চেতনাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষাকে নিয়ে গেছে বিশ্ব দরবারে। গোটা বিশ্ব আজ গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে সালাম, বরকত, জব্বারের আত্মত্যাগকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় বিশ্বের প্রতিটি দেশে। উগান্ডার একটি শিশু একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে মনে করে। তাই ভাষা আন্দোলনের পুরোটাই আমাদের অর্জনের। ভাই হারানোর বেদনা নিয়ে আমরা সাদা-কালোয় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ভাষা শহীদদের।
একুশের প্রভাত ফেরিতে আমাদের চোখে পড়ে সাদা-কালো নানা ঢংয়ের বর্ণের পোশাকে আচ্ছাদিত নর-নারী শিশু ছুটছেন। কারো শাড়িতে বর্ণমালা, কারো পাঞ্জাবিতে, কারো সাদা জামায় লাল-কালো আল্পনা। কারো ফ্রকে পাবেন সাদা ও কালোর খেলা।

ছেলেদের পাঞ্জাবিতে বর্ণমালাবিশ্বরঙয়ের কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন, মানুষের ভাষা তো অনেকভাবেই প্রকাশ পায়। আমরা ভাষাকে ফুটিয়ে তুলি পোশাকে। আর পোশাক তো শুধু গায়ে পরবার কোনও বস্তু নয়। এটি আমাদের আত্মপরিচয়। বিশ্বের দরবারে আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি তুলে ধরবার অন্যতম মাধ্যম পোশাক। আমি বলতে চাই পোশাক একটি দেশের পরিচয়। তাই দিবস অনুযায়ী পোশাকগুলো বা থিম ভিত্তিক কাজে বাংলাদেশকে তুলে ধরার চিন্তাটিই থাকে সর্বাগ্রে। একুশ, পহেলা বৈশাখ, বিজয় বা স্বাধীনতা দিবস সবদিনই আমরা চেষ্টা করি একেকটি নির্দিষ্ট মোটিফ দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকে প্রকাশ করতে। এরমধ্যে বর্ণমালা, কবিতার পঙ্‌ক্তি, গান হবে আমাদের মূল উপজীব্য।

আসলে একেক মানুষ একেকভাবে কাজের মাধ্যমে দেশের চেতনা তুলে ধরে। একজন গায়ক গানের মধ্য দিয়ে, একজন চিত্রশিল্পী ছবির মধ্য দিয়ে। আর আমরা পোশাকের মধ্য দিয়ে একুশকে তুলে ধরি। প্রজন্ম ও বিশ্বকে পোশাকের কাজের মধ্যে জানাতে চাই একুশের গর্বিত ইতিহাস।
একুশের রঙের প্রসঙ্গে বিপ্লব সাহা জানালেন, সাদা মানেই হচ্ছে শুদ্ধতা, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা। কালোর মধ্যেই রয়েছে সব রঙ। যদিও আমরা কালোকে অশুভ বা শোকের প্রতীক বলে বিবেচনা করি। তবে এটিও সত্য যে কালো ছাড়া গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। কালোর গুরুত্ব কোনওভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সাদা আর কালোর মিশেলেই প্রকাশ পায় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

বিবিআনার প্রধান লিপি খন্দকার বলেন, একুশের পোশাকে সবার প্রথমে আসবে রঙ, বিভিন্ন দিবসে বিভিন্ন মুড আর থিম আছে। একুশের প্রধান বিষয় হচ্ছে শোকের সঙ্গে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো। এটি বৈশাখ বা অন্য দিবসের মতো নয়, এটি ভাবগম্ভীর একটি বিষয়। সেটিকে বোঝাতেই কালো সংযুক্ত হয়েছে। আর সাদার অর্থ হচ্ছে শুদ্ধতা ও শ্রদ্ধা। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের দিনেও আমরা সাদা পোশাকের ব্যবহার দেখেছি। তখন থেকেই শুদ্ধ সাদা। এর সঙ্গে শোক যুক্ত হয়েছে। এ দুটো রঙ ছাড়া একুশকে কোনওভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু আমাদের আত্মত্যাগ আর লড়াই ছিল ভাষার জন্য, সেহেতু ভাষা ও বর্ণমালা এখানে অনেক বেশি সংযুক্ত। একুশের পোশাকে সাদাকালোর সঙ্গে বর্ণমালা কিংবা কোনও পঙ্‌ক্তিমালা ছাড়া ভাবাই যায় না। একুশ আমাদের অহংকার। এই অহংকারকে তুলে ধরতে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে পোশাকের কোনও বিকল্প পান না লিপি খন্দকার।
ছোট-বড় সবার পোশাকে একুশের ফ্যাশন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ও বিশিষ্ট ভাস্কর হামিদুজ্জামান বলেন, একুশ আসলে আমরা উজ্জীবিত হই। একুশ আমাদের শেকড়। নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরার বিষয়টি যেকোনওভাবেই হতে পারে। গতকালও আমরা শিল্পকলায় বর্ণমালা নিয়ে একটি ওয়ার্কশপ করিয়েছি। যেকোনওভাবে বর্ণ ও ভাষা ছড়িয়ে যাক। এটি যদি পোশাকের মাধ্যমে আমাদের নিত্যদিনের পরিধেয় বস্তুর মধ্যে ছড়িয়ে যায় তাহলে তো আরও ভালো। আমি এটিকে গর্বের বিষয় বলেই মনে করি। হয়তো একুশ নিয়ে অনেক মাধ্যমেই সচেতন করা যেতে পারে কিন্তু এটি একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। পোশাকে একুশের চেতনা তুলে ধরবার বিষয়টি সবসময় স্বাগত জানাই আমি।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন