গম চুরির ঘটনায় চট্টগ্রামের সাবেক খাদ্য নিয়ন্ত্রক বরখাস্ত

0
.

দক্ষিণ কোরীয়া থেকে দেশের খাদ্য অধিদফতরের জন্য (রাষ্ট্রীয়ভাবে) আমদানীকরা ৩ হাজার ৩৫৩মেট্টিক টন গম চুরির ঘটনায় চট্টগ্রামের সাবেক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব চলাচল ও সংরক্ষন মো. জহিরুল ইসলামকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

গম চুরির প্রায় চার বছর পর জাতীয় সংসদের খাদ্য বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ৩ নং সাব-কমিটির সুপারিশ ক্রমে চলতি মাসে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থা প্রশাসন শাখার সচিব শাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এমনটাই জানানো হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে দায়িত্বপালন শেষে মো. জহিরুল ইসলাম বরখাস্তের আগ পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ওয়েব সাইটের পেইজের নোটিশ বোর্ডে বরখাস্তের সেই আদেশপত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত ওই আদেশে চুরি যাওয়া গমের পরিমান ৩ হাজার ৩৫৩ মেট্টেক টন উল্লেখ করা হলেও গম সরবরাহকারী দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠান সামজিন লিমিটেড ও আর্ন্তজাতিক শিপিং এজেন্ট দাইয়ু কর্পোরেশনের দক্ষিণ কোরীয়া বীমা কোম্পানি মেরিটস ফায়ার অ্যান্ড মেরিন ইনস্যুরেন্সের পক্ষে ২০১৭ সালের ২০ জুন হাইকোর্টের বিদেশি লেনদেন নিষ্পত্তি বিভাগে (অ্যাডমিরালটি বিভাগ) মামলায় চুরি যাওয়া গমের পরিমান ৩৩ হাজার মেট্টিক টন উল্লেখ করেছে।

এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত দু’দিন ধরে চট্টগ্রম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে চলছে কানা-ঘুষা।

এর আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে গম আমদানীকৃত গম জাহাজ থেকে আনলোড করে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার সরকারি ও বেসরকরি গুদাম রাখা হয়। সেখান থেকেই কোনো এক সময় এসব গম চুরি যায়। যার মূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন সূত্রে আমরাও জানতে পেরেছি সাবেক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জহিরুল ইসলামকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের এখানে মন্ত্রণালয়ের লিখিত কোনো আদেশ বা অনুলিপি আসেনি। মো. জহিরুল ইসলামের কর্মষ্টেশন দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলায় হওয়ার কারণে হয়তো মন্ত্রণালয় থেকে এখানে কোনো পত্র পাঠায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ২০১৪ সালের নভেম্বরে জাহাজ থেকে আনলোড করে সরকারি খাদ্য বিভাগের গুদামে সরবরাহের আগেই ৩৩ হাজার মেট্রিক টন গম চুরি হয়ে যায়। এই গম বন্দরের সরকারি ও বেসরকারি গুদাম থেকে ৫ হাজার ৯২টি ট্রাকে করে সরিয়ে ফেলে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। আবার সেই গম বিক্রি করা চট্টগ্রামেরই কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে।

তবে জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে এনে পৌছিয়েও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বুঝিয়ে দিতে না পেরে আদালতের আশ্রয় নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বীমা কোম্পানি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ওইসব গম কেনার সময় প্রতি টনের দর ধরা হয়েছিল ৩৪৬ দশমিক ৩৫ ডলার (২৭ হাজার ৭০৮ টাকা)। সেই হিসেবে চুরি যাওয়া গমের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। খাদ্য অধিদপ্তরের জন আমদানি করা এই গম খাদ্য বিভাগের সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহের আগেই চুরি হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, জাহাজ থেকে গম খালাসের দায়িত্বে থাকা শিপিং এজেন্ট ও গুদামের মালিক অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়েছে। আর এ গম খালাস থেকে বিক্রি পর্যন্ত বিশাল এ আয়োজনের সঙ্গে এক যুবলীগ নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক একাধিক ব্যবসায়ী জড়িত। সরকারি একাধিক সংস্থার তদন্তে জড়িতদের নাম বেড়িয়ে এসেছে। এরপরও সরকারের প্রায় শত কোটি টাকার গম চুরির সাথে জড়িতরা রয়ে যায় অধরা। কোনো সুরাহা মিলেনি চুরি যাওয়া গমের।

এদিকে প্রায় চার বছর ধরেই চুরি যাওয়া গমের সন্ধান চাচ্ছে সরবরাহকারী দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠান সামজিন লিমিটেড। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দফতরে এ নিয়ে ধরনা দিয়েও কোনো কুলকিনারা পায়নি।

সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি) পৃথকভাবে এ বিষয়ে তদন্ত করেছে। গম চুরির ঘটনায় শিপিং এজেন্ট ও গুদামের মালিকপক্ষের সাতজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে সরকারের এই তিন সংস্থার তদন্তের ভিত্তিতে। একই ঘটনায় এ পর্যন্ত চারটি মামলা দাঁড়িয়েছে দুই প্রতিষ্ঠানের জড়িতদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, গম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এদেশীয় এজেন্টের করা মামলায় গম চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের দুজন জামিন নিলেও চারজন পুলিশের খাতায় পলাতক। কিন্তু প্রকাশ্যে ঘুর বেড়াচ্ছে তারা। এদের মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে গত তিন বছরে সরকারের খাদ্য বিভাগে অনিয়ম ও চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুইটি মামলা হয়েছে।

গম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষ এজেন্ট আবদুল আজিজের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ব্যবসায়ী ও নেতাদের জড়িত থাকার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। চার বছর ধরে গম কেলেঙ্কারির সুরাহা না হওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ২০১৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানি সামজিন লিমিটেডের মাধ্যমে আমদানি হওয়া গম চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাসের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের কিছু বিধিনিষেধ ছিল।

আমদানিকারকের জিম্মায় ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (খাদ্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টম) তদারকিতে তা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তারপরও বন্দর এলাকার গুদাম থেকে ওই গম পাঁচ হাজারের বেশি ট্রাকে করে পাচার হয়ে গেলেও সরকারি কোনো সংস্থা তা থামাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং পাচার হওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তর থেকে রপ্তানিকারককে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, শর্ত ভঙ্গের কারণে আর ওই গম তারা নেবে না।

ওই গম আমদানির সময় খাদ্য অধিদফতরের ক্রয় বিভাগের ‘চলাচল ও সাইলো’ বিভাগের পরিচালক ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন। গমের যৌথ তদারকির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। গম চুরির ঘটনায় তাঁর বিভাগ থেকে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে তোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে দুদক থেকে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ও অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে ওই গম খালাস হয়েছিল। সেখান থেকে রপ্তানিকারকের প্রতিনিধি নিয়ে কোনো গুদামে রেখেছে বা কী হয়েছে, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়।’

গম চুরি যাওয়ার ঘটনায় কোনো সুরাহা করতে না পেরে আর্ন্তজাতিক শিপিং এজেন্ট দাইয়ু কর্পোরেশনের দক্ষিণ কোরীয়া বীমা কোম্পানি মেরিটস ফায়ার অ্যান্ড মেরিন ইনস্যুরেন্সের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ২০ জুন হাইকোর্টের বিদেশি লেনদেন নিষ্পত্তি বিভাগে (অ্যাডমিরালটি বিভাগ) মামলা করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম অতিরিক্ত মহানগর হাকিমের আদালতেও সাতজনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করা হয়। এই দুই মামলার আসামিদের একজন ওই গমের প্রথম ক্রেতা রোকেয়া ফ্লাওয়ার মিলসের মালিক সাইফুল ইসলাম।

চুরি যাওয়া গমের গম আমদানির শিপিং এজেন্ট জে কে শিপিংয়ের চারজন কর্মকর্তাকেও একই মামলার আসামি করা হয়েছে। তাঁদের একজন শিপিং কোম্পানির কর্মকর্তা ও খুলনা যুবলীগের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে সভাপতি শওকত হোসেন।

জে কে শিপিংয়ের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ও প্রধান নির্বাহী কামরুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালামও এ মামলার আসামি। তবে চোরের আতুর ঘরের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত ও বন্দরে গুদামে সংরক্ষিত গমের গুদামজাতের দায়িত্বে থাকা আবদুল মালেক মাঝি ও জাহাজের এজেন্ট আক্তারুজ্জামান খান এ মামলা থেকে বাদ পড়েন নি।

এদিকে গম চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে দু’দফা তদন্ত হয়। দুদক ও পুলিশ পুথকভাবে তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনে। প্রথমে দুদক তদন্তকরে প্রতিবেদন দেয়ার পর পরই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) আরও অধিকতর তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মামলার বেশির ভাগ আসামি পলাতক থাকার কারণে তাদের জবানবন্দি ও তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না বলে দায় এড়ালেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু ফেইসবুকসহ সকল স্থানে বিচরণ যদিও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তার সামনে।

জানাগেছে, গম চুরি যাওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে থাকা জে কে শিপিংয়ের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা করেছেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এদেশীয় বিশেষ এজেন্ট আবদুল আজিজ। সেই মামলায় জে কে শিপিংয়ের মালিক নুরুল ইসলাম, কামরুল ইসলামসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি আছে আদালত থেকে।

দক্ষিণ কোরিয়া বিমা কোম্পানির করা মামলায় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শওকত হোসেন চুরি যাওয়া গমের একটি অংশ বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। খুলনা যুবলীগের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতির দায়িত্বে থাকা শওকত হোসেনকে খুঁজে পাচ্ছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক।

এ গম চুরি যাওয়ার ঘটনায় দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৩ হাজার টন গমের প্রধান ক্রেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম। ওই গম সাইফুল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাঁচজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেছেন। চাপাইর সাইফুল থেকে চট্টগ্রামে গম কেনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন হলেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবর আলম।

২০১১ সালের এপ্রিলে খাদ্য অধিদফতরের গুদাম থেকে গম পাচারের অভিযোগে সাইফুল ইসলাম গ্রেফতার হন। ঠিক এক বছর পর ২০১২ সালের জুনে খাদ্য অধিদফতরকে নিম্নমানের গম সরবরাহ করে ফের আলোচনায় আসে তার প্রতিষ্ঠান রোকেয়া ফ্লাওয়ার।

চোরের আতুর ঘর বাসিন্দা বলে পরিচিত আবদুল মালেক মাঝির তত্ত্বাবধানেই ২০১৪ সালের নভেম্বরে আসা ওই গম চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার সাতটি সরকারি-বেসরকারি গুদামে নিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকেই চুরে যায় ৩৩ হাজার মেট্টেক টন গম। পরবর্তি জুলাই মাসে চট্টগ্রামের হালিশহরের খাদ্য অধিদফতরের কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম থেকে চাল পাচারের ঘটনায়ও মালেক মাঝিকে আসামি। গত বছরও একটি মামলা হয় সরকারি খাদ্যগুদামের চাল পাচারের অভিযোগে।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য দিন