নিউজিল্যাণ্ড মসজিদে হামলা, জুমার নামাজে হত্যা ট্রাজেডি

3
ব্রেকিং নিউজ
  •                 
হামলার শিকার আল-নূর মসজিদ। ইনসেটে লেখক।

এম. এন মোস্তফা নূর, এডভোকেট

আমরা ভাষা ব্যবহারে শালীন এবং দায়িত্বশীল হবো। আবেগ সংযত রাখবো। কারণ! আমরা নেতৃত্বদানকারী জাতি। আমরা পরকালে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করি। আমরা প্রতিক্রিয়াশীল নই বরং ক্রিয়াশীল জাতি। আমাদের রয়েছে একটি পরীক্ষিত আদর্শ। আমরা কোনো অবস্থাতেই আমাদের আদর্শবাদকে পাশে ঠেলে রেখে অন্য কোনো অপকৌশলে কার্যসিদ্ধি করতে পারিনা। সর্বোপরি আমরা প্রতিশোধ প্রবণ কোনো জাতি নই। আমাদের আদর্শ সে শিক্ষা আমাদের দেয়নি। আমরা প্রতিশোধের জন্যে লড়াই করিনা। মানবতার কল্যাণে সত্য এবং সাম্যকে বিজয়ী করার সংগ্রাম আমরা করি। আর সে জন্যে আমরা অতি উজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। পৃথিবীতে সামগ্রীক মানবতার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে আমাদের দ্বারা। পৃথিবী বর্বরতা মুক্ত শালীন এবং সংস্কৃতবান হয়েছে আমাদের হাতে। পৃথিবী উর্বর হয়েছে আমাদের রক্ত-ফসিলে। আমাদের অবিরাম ত্যাগ-তিতিক্ষায় সভ্যতা পশুবৃত্তি হতে মুক্ত হয়ে চরম নির্লজ্জতা হতে বেরিয়ে এসেছে।

আজ ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রীষ্টাব্ধ। নিউজিল্যাণ্ড’র ক্রাইষ্টচার্চের মসজিদে জুমার নামাজে সমবেত মুসল্লিদের উপর এক (অষ্ট্রেলীয় খ্রীষ্টান) বর্বর অস্ত্রধারী স্বেতাঙ্গ জঙ্গী সন্ত্রাসীর টার্গেট ফায়ারে পঞ্চাশ জনের মতো নিরীহ নামাজরত মুসল্লি খুন (শহীদ) হয়েছেন। আমরা তাদের সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করি মাহান আল্লাহর নিকট। তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের সকল সদস্যগণের প্রতি জানাই গভীর শোক এবং সমবেদনা। এই ঘটনায় অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সদস্যগণ।

এই লোহর্ষক ঘটনায় হতবিহ্বল বিশ্ব। নিউজিল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দর আরদেরন স্বয়ং টিভি মিডিয়ায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন, অষ্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী স্কট মোরিসন নিজেও এই বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। বিশ্বনেতারা নিন্দা জানাচ্ছেন। জঙ্গী সন্ত্রাসী বাহিনীর ছয় সদস্য মিলে একজনের নেতৃত্বে তারা নিঃসংশ বর্বরততম খুনের ঘটনা চালিয়েছে পরপর দুটি মসজিদে। খুনীরা নিজেদের নিঃসংশতা অনলাইনে লাইভ প্রচার করেছে। তারা বিশ্ব মোড়লদের চোখে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের মানসিক উন্নতির চরম উৎকর্ষের পরিণতি কেমন! বিশ্ব মোড়লদের চরম লজ্বায় ফেলে দিয়েছে তারা জঙ্গীরা। এখন তাদের (বিশ্ব মোড়লদের) দায়িত্ব যে, তারা (খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বশীল বিশ্ব নেতৃবৃন্দ) কীভাবে তাদের এই শ্বেতাঙ্গ জঙ্গীগ্রুফকে দমন করবেন। শাস্তির মুখোমুখি করবেন। তাদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করবেন সেটার দিকে নজর দিতে হবে। শান্তিকামী বিশ্ববাসীকে।

আমরা এই উনবিংশ শতকের প্রান্তসীমা হতে বিংশ শতকের প্রারম্ভিক সময়ে এসে দেখছি অভিভাবকহীন ছন্নছাড়া মুসলিমবিশ্ব, ভারসাম্যহীন বিশ্বব্যবস্থা। এই হামলা কোনো ব্যক্তিগত হামলা নয়। এটা ভয়ঙ্কর একটি ইসলাম বিদ্বেষি গৌষ্ঠির হামলা, পুরো মুসলিম কওমের উপর। কিন্তু আজ কি আমরা সেই কওম বলে একটি সক্রিয় চেতনায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অবস্থান করি? পরিষ্কার উত্তর আসবে, না। আজ যাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হলো তারা কি কোনো প্রতিপক্ষ যোদ্ধা ছিলো? নাতো। না। তাহলে কেনো এই হত্যাকাণ্ড? কেনো? ধর্মীয় উপাসনালয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করে দিন- দুপুরে নিরস্ত্র ইবাদতরত মানুষের উপর গুলি চালিয়ে হত্যা করার ফলাফল কী হতে পারে। কী হতে পারে খুনীর উদ্দেশ্যে? আমরা এই সবকিছুই বিবেচনায় নিই বা না নিই এই নির্মমতার বিচার এবং অবসান চাই। প্রতিশোধ চাইনা। নির্মমতা চাইনা। এটা কোনো গেইম এণ্ড গেইম এর বিষয় নয়।

তাহলে কীভাবে আমরা এইসব ভয়াবহ সন্ত্রাসের মোকাবিলা করবো? ফলে আমাদেরকে বিশ্বসম্প্রদায়ের অন্যান্য সকলের সহযোগীতা নিয়ে (যতটা পারা যায়) সাধ্যমতো চেষ্টা করে যেতে হবে। এটা সময়ের জন্যে বলছি। হাঁকাবকা কিংবা গরম গরম পংক্তি উচ্চরণ করেতো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রন নেওয়া যাবেনা। সেভাবে কিছুই হয়নি পৃথিবীতে।। আগে সন্ত্রাসীদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এদের নেতাদের লজ্জা দিতে হবে। এদের উন্মাদ, উলঙ্গ, বেহায়া সংস্কৃতিকে একঘরে করে দিতে হবে।

অনেকেই কিংবা সবাই আবেগ আর ভালোবাসার কারণে নিজ ধর্মের পক্ষে বা নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষে বা ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষে স্বোচ্ছার হবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাব-ভাষা ব্যবহারে তাদেরকে অতি সতর্ক থাকতে হবে। কথা-বার্তা লিখন পঠন-পাঠন প্রচার ইত্যাদিতে মার্জিত থেকেই সব বিষয় যুক্ত করে চিন্তার সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। নাকি ভাবনা-চিন্তাহীন অতিদ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় গা ভাসিয়ে দেবেন? যাতে বিপরীত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অনেক রক্তের অর্জন টুকু ধূলায় মিশে মলিন হয়ে হয়ে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে অপরিণামদর্শী কতিপয় অতিবিপ্লবীদের নিকট অতীতের আচরণ, ফাঁপা ঘোষনা, কথিত দায় স্বীকার, বক্তৃতা এবং বিবৃতির কুফল ভোগ করেছি, দিয়েছি চরম মূল্যের মাসুল।

এমন সব কথা আশা করি কোনো মুসলিম বলবেননা। বলতে পারেন না। যে কথায়, যে বিবৃতিতে ভালো-মন্দ সৎ-অসৎ সবাইকে গুলিয়ে ফেলে। একজন জঙ্গী বা একদল জঙ্গীর কর্ম-কাণ্ডের জন্যে তার ধর্ম বা তার গৌষ্ঠির সকলকে একপাল্লায় নিয়ে ওজন করে দেবেন কেনো! এভাবে বাচ-বিচারহীন আচরণ করলে অন্যায়ভাবে সেই জঙ্গীদলই লাভবান হবে, সেল্টার পাবে। যেনোতেনো ভাবে দায়-দায়িত্বহীন মুখরোচক কথা বললে, তড়িৎ সস্তা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে জঙ্গীবাদীরা সংখ্যায় বেড়ে যাবে। আমরা কেনো জঙ্গীদের দলবল বাড়িয়ে দেবো! জঙ্গীদের আরো শক্তিশালী হবার সুযোগ করে দেবো কেনো! আপনি কি তাই হতে দিতে পারেন? ফলে আমাদের কথা বলতে হবে সাবধানে। অতি সাবধানে কথা বলুন। একজনের বা একটি গ্রুফের সন্ত্রাস, অপকর্ম কিংবা দোষকে তাদের পুরো বর্ণ, ধর্মানুসারীদের ঘাঁড়ে তুলে দেবার কোনো যৌক্তিক অধিকার ইসলাম আপনাকে আমাকে দেয়নি। সেটা কখনো যুক্তিযুক্ত নয়।

আমরা সবার, সবাই আমাদের। আমরা বিশ্বাসী এবং সকল বিশ্বাসীরাই আমাদের বন্ধু। সকল অবিশ্বাস, মিথ্যা, অনিষ্ট, অন্ধকারের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর সাথেই আছি আমরা। আমরা সকল মজলুমের ভাই। সকল মুক্তিকামীর সহযোদ্ধা। এখানে জন্মসূত্রে কোনো ধর্ম, বর্ণ ভেদাভেদের স্থান নেই। যার যার কর্মসূত্রে বিচার হবে। সুযোগ থাকবে অপার সুযোগ সংশোধন এবং ফিরে আসার সুযোগ কখনো বন্ধ হয়ে যাবেনা। আমার আমাদের প্রতিপক্ষকে যে কোনো সময় ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত থাকে। ক্ষমা এবং পরিত্রাণের জন্যে আমরা দুবাহু মেলে আছি বিশ্বময়।

লেখক-এম. এন মোস্তফা নূর- এডাভোকেট
চট্টগ্রাম জজ কোর্ট।

3 মন্তব্য