ধানসিঁড়িতে একদিন

0
ব্রেকিং নিউজ
  •  

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

                     

       

.

যদি জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী দেখতে চান তবে পার হতে হবে নদীর পর নদী।

তারও আগে যেতে হবে ঝালকাঠি।

ফ্রেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের বুধবার হুট করেই প্যাডেল স্টিমার পিএস মাসহুদ’য়ে চেপে ঝালকাঠি রওনা হয়ে বুড়িগঙ্গার জলে শুরু করে ভোর পাঁচটায় বরিশালে কীর্ত্তনখোলা হয়ে একটু আগে মানে সকাল সাড়ে আটটায় সুগন্ধার তীরের ঝালকাঠি ঘাটে নামলাম।

ঢাকা শহর থেকে হালকা শীতের আমেজ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও। ঝালকাঠি নেমে শীত ভালোই টের পেলাম।
ছোট্ট মফস্বল শহর ঝালকাঠি। শহর ছোট হলেও এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশাল।

সুগন্ধা নদী তীরের ঝালকাঠিকে ঘিরে আছে কীর্তনখোলা, বিষখালী, গাবখান, জাঙ্গালিয়া, বাসন্ডা ও ধানসিঁড়ি নদী আর কীর্তিপাশা, কুরিয়ানাসহ অনেক ছোট-বড় খাল। এখানে রয়েছে কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ি, গাবখান সেতু, সুজাবাদ কেল্লা, নেসারাবাদ মাদ্রাসা, কবি কামিনী রায়ের বাড়ি ও রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মস্থানসহ শীতলপাটি শিল্প, মৃৎশিল্প ও পেয়ারার গ্রাম ভীমরুলি।

আছে চেয়ে দেখার মতো অজস্র গাছপালা আর মনে রাখার মত মানুষ। এখানকার মানুষগুলো আকৃতিতে মানুষ নয়, সত্যিকার অর্থেই মানুষ। মতিলাল রায়, ঝরনা বাড়ৈ, সোহানুর রহমান-সহ এমন মনে রাখার অনেক প্রিয় মানুষ রয়েছে এখানে।
তেমনি একজন ‘ফারদিন’ লঞ্চের টিকিট মাস্টার ইসহাক শেখ। তার সঙ্গে কথা বলে পাশে স্টিমারঘাটের কাছের হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নৌকাঘাট এসে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করি।

তারপর প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে যাত্রা শুরু। ধানসিঁড়ি নদীর রূপ-সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছিল কবি জীবনানন্দ দাশকে। নদীর জলে ভেসে ভেসে কবি লিখেছিলেন আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়। লেখার পর আবার কখনও ধানসিঁড়ির কাছে গিয়েছিলেন কি না জানি না, তবে জীবনানন্দ দাশ তার সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ রূপসীবাংলায় ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি লিখে ধানসিঁড়ি নদীকে অমর করে রেখে গেছেন।
ধানসিঁড়ি নদী সুগন্ধা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় নয় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাজাপুরের কাছে জাঙ্গালিয়া নদীতে মিশেছে। আমাদের বাহন ইঞ্জিন চালিত নৌকা এখন সুগন্ধা নদী হয়ে বিষখালী নদীর পাশ দিয়ে মোহনার কাছে চলে এসেছে।

বামে এখন বিষখালী নদী, পেছনে সুগন্ধা। একটু সামনে গাবখান নদী। তারপরই আমাদের কাঙ্ক্ষিত ধানসিঁড়ি নদী।
চারটি নদীর সংযোগস্থল থেকেই ধানসিঁড়ি নদীর শুরু। ধীরে সুস্থ্যে আমাদের নৌকা মোহনা হয়ে ধানসিঁড়ি নদীর দিকে এগিয়ে যায়। তারপর বামে বাঁক নিয়ে সোজা প্রবেশ করে ধানসিঁড়ি নদীতে।

ধানসিঁড়ি নদীতে আমার চলা সেই শুরু, সেই প্রথম। এমন ভালোলাগার অনুভূতি, উচ্ছ্বাস প্রকাশ ভাষা হারিয়ে ফেলে। অসংখ্য ভালোলাগার মুহূর্ত মুখ থেকে কেবল অস্ফুটে বের হয়ে আসে- “আহ, প্রিয় ধানসিঁড়ি!”
জলবায়ু যোদ্ধা প্রিয় অনুজ সোহানুর রহমান সোহান বরিশাল থাকলেও তার শেঁকড় ঝালকাঠিতে। দেখা হলেই সে বলে, “চলেন ধানসিঁড়ি বেড়িয়ে আসি।”

যেখানে ধানসিঁড়ির শুরু সেখান থেকে শুরু করে জাঙ্গালিয়া নদীর যেখানে সে মিশে গেছে ওই পর্যন্ত আমরা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করবো। নদীর যৌবনকালের গল্প শুনবো এলকাবাসির কাছ থেকে। প্রত্যক্ষ করবো প্রিয় কবি নদীর যে রূপ-রসে মুগ্ধ হয়েছিলেন, সেই অবস্থার কি করুণ পরিণতি হয়েছে!
সোহানের সঙ্গে যাওয়া না হলেও এবার ধানসিঁড়ি নদীতে ঠিকই এলাম।

আজ এই গল্প জেনে বসে থাকবেন না। নদীর কাছে ছুটে আসবেন, যেভাবে আপনারা পাহাড়ের কাছে চলে যান। তারপর চেষ্টা করবেন আপনার প্রিয় নদীর অপমৃত্যু রক্ষার!
ধানসিঁড়ি নদীর শুরুতে নদীর দুপাড়ে প্রবেশটুকু ছাড়া কোথাও খোলা প্রান্তর ঠিক সেভাবে পেলাম না। প্রবেশ মুখ পার হতেই দেখলাম নদীপথ সরু হতে শুরু করেছে।

একটু পরপর বাঁশের তৈরি ব্রীজের দেখা পেলাম। রড-সিমেন্টের ব্রিজও দেখলাম বেশ কয়েকটা। সেসবের নিচ দিয়ে লঞ্চ-স্টিমার দূরে থাক, ছোট পাল তোলা নৌকাও এপাড় ওপাড় হবে না। অথচ এই ধানসিঁড়ি নদীর বুকে এক সময় বড় লঞ্চ ও স্টিমার-সহ বাদাম ওড়ানো বিশাল সব নৌকার গতিপথ ছিল। সে নদী কেনো এমন মরানদী হল।
নদীর দেশে নদীর মৃত্যু, চিন্তা করা যায় না! শুধু নদী কেনো, এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য কিছুই এখানে আগের মতো নেই। চলতি পথে লোকজনের কত অভিযোগ শুনতে হল প্রিয় ধানসিঁড়ির বেহাল দশার জন্য।

আমরা বৈদারাপুর নৌকা বাঁধার ঘাট পেয়ে যাত্রা বিরতী দেই। আশিতর দোলারা বিবি হাতে ক্যামেরা দেখে মুখ লুকায় শাড়ির আঁচলে। ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিতুমিয়া।
তারপর দুইটা কিছু খেতে তার বাড়ি যেতে অনুরোধ করেন আবু বকর লস্কর।

আমরা তার সে অনুরোধ বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে একটা চায়ের দোকান পেয়ে চা পান করি, এলাকার লোকদের সঙ্গে নদীর গল্প করি, সেই অতীত আর বর্তমান পর্যালোচনা করি। চলে আসে শীত ও বর্ষার পার্থক্য।
ইতিমধ্যে ছেলে-বুড়োর ভীড় জমে গেছে, সে ভীড় বাড়তে না দিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি আবার নৌকায় চড়ে বসি। এভাবে যতটাই সামনে এগিয়ে যায় আমাদের নৌকা ততটাই ধানসিঁড়ির ম্রিয়মান অবস্থা দেখে মন কেঁদে ওঠে, দুচোখের পাতা ঝাঁপসা হয়ে আসে।

প্রয়োজনীয় তথ্য
প্রাচীন মহারাজগঞ্জ বর্তমানের ঝালকাঠি। এখানকার জেলে সম্প্রদায় ও জঙ্গলাকাঠি মিলে এর নাম হয়েছে ঝালকাঠি। ঝালকাঠি আসা একেবারে সহজ। ঢাকার সদরঘাট থেকে সরাসরি ঝালকাঠির লঞ্চ আসে। আবার লালকুঠি ঘাট থেকে আসে স্টিমার। লঞ্চ ছাড়ে রাত আটটায়। স্টিমার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। সিঙ্গেল বা ডাবল বা ফ্যামিলি কেবিনে বা ডেকে চলে আসতে পারেন। কেবিন ভাড়া সিঙ্গেল ৮শ’ টাকা। ডাবল ১ হাজার ৬শ’ টাকা।

স্টিমারের ভাড়া কম। তবে স্টিমারে সিঙ্গেল কেবিন নেই। ডেকের ভাড়া ৩শ’ টাকা।
সকালে ঝালকাঠি নেমে খেয়াঘাট থেকে নৌকা রিজার্ভ নিয়ে চলে যান নদীর পর নদী পারি দিয়ে ধানসিঁড়িতে।

ঝালকাঠিতে থাকার জন্য মোটামুটি মানের হোটেল রয়েছে। লঞ্চ বা স্টিমার ঘাটের পাশেই এসব হোটেলে থাকতে পারবেন। খাওয়ার জন্য একইভাবে ঘাটের পাশের সাধারণ রেস্তোরাঁর ওপর অসাধারণ ভরসা করতে পারেন।

মনে রাখবেন
নৌকায় চলাচল করতে হবে। সুতরাং সঙ্গে গামছা ক্যাপ বা টুপি এবং খাবার পানি সঙ্গে রাখবেন। নদীর পানিতে ভুলেও বিস্কুট, চিপস, লজেন্স, ইত্যাদির প্যাকেট ও পানির বোতল ফেলবেন না। সাঁতার জানলেও সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে রাখবেন।

কোন মন্তব্য নেই