পোর্ট সিটির ছাত্রী মুন্নী হত্যাঃ তিন বছর পর পুলিশের জালে মূল আসামী!

1
.

২০১৬ সালের ১৩ মে, শুক্রবার দুপুর ১২টা দিকে চট্টগ্রাম নগরীর পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় (পটিয়া) যাওয়ার উদ্দেশে বের হয়ে নিখোঁজ হয় মুন্নী আকতার।  কিন্তু পর দিন ১৪ মে শনিবার সীতাকুণ্ডের  ইকো পার্ক থেকে অজ্ঞতনামা লাশ হিসেবে মুন্নীর মরদেহ উদ্ধার করে সীতাকুণ্ডে থানা পুলিশ।

পত্রিকায় ছবিসহ খবর প্রকাশ হলে তারও একদিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে মুন্নীকে সনাক্ত করেন মুন্নীর মা হোসনে আরা বেগম।

নিখোঁজ হওয়ার পর মুন্নীর মায়ের সাথে থেকে মুন্নীকে বিভিন্ন জায়গায় খোজাখুঁজি করেন মুন্নীর চার বন্ধু জ্যোতি, মারুফ, সজিব, নাসরিন। এমন কি লাশ পাওয়ার পর পোস্ট মোর্টেম থেকে শুরু করে মুন্নীর দাফন করা পর্যন্ত সবাই ছিলেন হোসনে আরার পাশে। শোক সহ্য করতে না পেরে মেয়ের বন্ধুদের কাঁধে মাথা রেখেও কেঁদেছেন তিনি। কেঁদেছে তারাও।

কিন্তু মেয়েকে দাফনের পর থেকেই বদলে যায় প্রেক্ষাপট। আশেপাশে কোথাও নেই মেয়ের বন্ধু-বান্ধবীরা। মুন্নীর মতোই হঠাৎ করেই নিখোঁজ সবাই। বলেন, হোসনে আরা।

মুঠো ফোনে তিনি আরও বলেন, কে জানতো যাদের সাথে নিয়ে আমি আমার নিখোঁজ মেয়েকে খুঁজে বেড়িয়েছি, তারাই আমার একমাত্র মেয়েকে হত্যা করে লাশ ফেলে গিয়েছিলো জঙ্গলে।

হত্যার প্রায় ৩ মাস পর ৩ আগস্ট নগরী পোর্ট কলোনী থেকে রমজান আলী রাহাত নামে মুন্নীর সাবেক প্রেমিককে আটক করে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ। তার দেয়া স্বীকারুক্তি মতে একই দিন আটক করা হয় মুন্নীর বান্ধবী ফাহমিদা জাহান জ্যোতিকে (দুজন বর্তমানে জামিনে)।

পরদিন আদালতে দেয়া রমজান আলী রাহাত স্বীকারুক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, মূলত ত্রিফল প্রেমের কারণেই পরিকল্পিতভাব খুন করা হয় মুন্নীকে। আর এই হত্যাকান্ডে অংশ নেয় মারুফ উল ইসলাম, ফাহমিদা জাহান জ্য্যেতি, সজিবুল চৌধুরি, নাসরিন আক্তার ও রমজান আলী রাহাত নিজেই। প্রায় ৬ মাসের পরিকল্পনায় ৫জন মিলে খুন করা হয় মুন্নীকে।

রাহাত আরও জানায়, নগরীর পলিটেকনিক্যাল ইনিস্টিটিউটে পড়াকাীলন সময়ে আমার (রাহাত নিজেই) সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো মুন্নীর।  কিন্তু সেখান থেকে পাশ করে বেড়িয়ে পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর সে আমাকে ভুলে যায়। নতুন করে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে নাসরিনের প্রেমিক মারুফের সাথে।

বান্ধবী মু্ন্নীকে হত্যা করে দুজন সুখের সংসারে পা রেখেছিলেন। কিন্তু পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন মারুফ।  গ্রেফতারের আগেই বিয়ে করেন নাসরিনকে।

রাহাত জানান, মূলত মুন্নীকে সায়েস্তা করতে ঘটনার আগে তিনদফা বৈঠক হয় জ্যোতির বাসায়। বৈঠকে মুন্নীকে হত্যা করার পরিবল্পনাও হয়। পরিকল্পনা মতো জ্যোতি বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে, মুন্নীকে ভার্সিটি থেকে একেখান এলাকায় ডেকে আনে। সেখান থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে ইকো পার্কে যায় তারা।

রাহাত আরও জানায়, সারাদিন ঘোরাঘুরির পরে সন্ধ্যায় নির্জন পাহাড়ে ছুড়ি দিয়ে কুপিয়ে মুন্নীকে খুন করে সে ও মারুফ। এরপর মুন্নীর লাশ খাদে ফেলে দিয়ে সেখান থেকে যে যার যার বাসায় ফিরে যায় তারা।

হত্যাকান্ডের তিনমাস পর অভিযুক্ত দুইজনকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলেও পলাতক ছিলো মামলা অপর তিন আসামী মারুফ উল ইসলাম, সজিবুল চৌধুরি, নাসরিন আক্তার।  প্রায় তিন বছর দেড় মাস পর গত ২৬ জুলাই নগরীর খুলশী এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামী মারুফ উল ইসলাম ও নাসরিন আক্তারকে গ্রেফতার করেন মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ। তবে এখনো পলাতক মামলার আরেক আসামী সজিবুল চৌধুরী।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আসামীদের ঠিকানা না থাকার কারনে তাদের গ্রেফতার করা ছাড়াই আদালতে চার্জশিট দেয় আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা। কিন্তু আদালত আসামীদের ঠিকানা বের করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

মুন্নীর মা হোসনে আরা বলেন, গত ২০ জুন মামলাটি তদন্তের জন্য পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদকে দায়িত্ব দেয়া হলে মাত্র ছয়দিনের মধ্যে (২৬ জুন) মুন্নী হত্যাকান্ডের মুল আসামী মারুফ ও নাসরিনকে (৬মাস আগে তারা বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন)  গ্রেফতার করেন তিনি। কিন্তু এর আগে তিনটি বছর কোনো তদন্ত কর্মকর্তা তাদের ঠিকানা খুঁজে পায় নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক ও মামলার আইও আবুল কালাম আজাদ পাঠক ডট নিউজকে বলেন, অপরাধীরা যত চালাকই হোক না কেন কোনো না কোনো সূত্র রেখে যায়। আমি সে সুত্র ধরেই এগিয়েছি।

*সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের পাহাড় থেকে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার

প্রথম মন্তব্য